Printed on Sun Sep 19 2021 11:53:27 PM

অশুভ নয়, প্রকৃতির বন্ধু শকুন

নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয়ভিডিও সংবাদ
অশুভ
অশুভ
শকুনকে অনেকে অশুভ পাখি মনে করলেও এটি আমাদের বন্ধু। এই বর্জ্যভুক পাখিটি প্রকৃতিকে পরিস্কার করে পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। তাই শকুনকে প্রিকৃতির পরিচ্ছন্নতা কর্মীও বলা হয়। এরা মূলত মৃত প্রাণীর মাংস খেয়ে বেঁচে থাকে। এই মৃত প্রাণী যেসব জীবাণু বহন করে তা যদি পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ত তাহলে মানুষের প্রাণহানিসহ মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় তৈরি হত। খাদ্য চক্রে শকুন মৃত প্রাণী খেয়ে সেসব রোগ-বালাই থেকে আমাদের রক্ষা করে। শকুনই একমাত্র প্রাণী যাদের পাকস্থলি অ্যানথ্রাক্স, কলেরা, খুড়া রোগসহ নানান জীবাণু ধ্বংস করতে সক্ষম। গত দুই যুগে বাংলাদেশ থেকে শকুন বিলুপ্তির পথে। শুধু এদেশেই নয় সারা পৃথিবীর ৯৯ মধমিক ৯ শতাংশ শকুনিই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

শকুন সাধারণত অসুস্থ ও মৃতপ্রায় প্রাণীর চারদিকে শিকারি পাখির মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে উড়তে থাকে এবং প্রাণীটি মরার জন্য অপেক্ষা করে। প্রাণীটি মারা গেলেই তাকে খাওয়ার জন্য শকুনরা হামলে পড়ে। শকুন খুব একটা প্রয়োজন না হলে জীবন্ত প্রাণী শিকার করে খায় না। এদের গলা, ঘাড় ও মাথায় কোনো পালক থাকে না। প্রশস্ত ডানায় ভর করে আকাশে ওড়ে। বট, পাকুড়, অশ্বত্থ, ডুমুর প্রভৃতি বিশালাকার গাছে সাধারণত লোকচক্ষুর অন্তরালে শকুন বাসা বাঁধে। গুহায়, পর্বতের চূড়ায় বা গাছের কোটরে এরা এক থেকে তিনটি সাদা বা ফ্যাকাসে ডিম পাড়ে।

শকুন কখনও শত্রুকে আক্রমণ করে না বরং এড়িয়ে যায়। এটি মূলত নিরীহ প্রাণী। শকুনকে ১১ কিলোমিটার উঁচুতেও উড়তে দেখা গেছে। শকুন ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার বেগে উড়তে পারে। তবে ভূমিতে নামার সময় এর দ্বিগুণ গতিতে নামে।

বিভিন্ন শকুন ওজন এবং আকারে উল্লেখযোগ্যভাবে পৃথক হয়। ছোট শকুনের ওজন মাত্র দেড় কেজি, দৈর্ঘ্য ৬৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত। এর লেজটি ছোট, কিছুটা গোলাকার। মাথা এবং ঘাড় প্লামেজ বিহীন। এগুলি প্রায়শই সম্পূর্ণ উলঙ্গ থাকে। এ পাখির রয়েছে বিশাল ডানা, যার দৈর্ঘ্য শরীরের দৈর্ঘ্যের চেয়ে দুই থেকে আড়াই গুণ বেশি।

পাখিটির ঘাড়ে বিশেষ উপায়ে রিম আকারে ছড়িয়ে পড়া পালক রয়েছে। যা শিকার কাটার সময় শকুনকে নোংরা হতে দেয় না। পালকের একটি আংটি শিকারের প্রবাহিত রক্তকে ধারণ করে।

শকুন দেখতে ধূসর, কালো, সাদা, বাদামী টোনগুলির সংমিশ্রণ। রঙ বা আকারের দ্বারা অন্যান্য পাখির লিঙ্গ পার্থক্য করা অসম্ভব হলেও শকুনের যৌন বর্ণের কোনও বিশেষ প্রকাশ নেই।

সারা বিশ্বে প্রায় ১৮ প্রজাতির শকুন দেখা যায়। বাংলাদেশে প্রায় ছয় প্রজাতির শকুন রয়েছে। চার প্রজাতি স্থায়ী আর দুই প্রজাতি পরিযায়ী। এগুলো হলো, রাজ শকুন, গ্রিফন শকুন বা ইউরেশীয় শকুন, হিমালয়ী শকুন, সরুঠোঁট শকুন, কালা শকুন ও ধলা শকুন। সব প্রজাতির শকুনই সারা বিশ্বে বিপন্ন। স্থায়ী প্রজাতির মধ্যে রাজ শকুন (Sarcogyps calvus) অতি বিপন্ন।

ভারতীয় উপমহাদেশে যেখানে আগে চার কোটি শকুন ছিল সেখানে এখন মাত্র ৪০ হাজারের মতো বাংলা শকুন টিকে আছে। বর্তমানে বাংলাদেশে শকুনের সংখ্যা আড়াই শ এর ঘরে। গবেষকদের মতে শকুন বিলুপ্তির কারণ পশু চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনাক ও কিটোপ্রফেন জাতীয় ব্যথানাশক ওষুধের ব্যবহার। এই জাতীয় ওষুধ হজমের জন্য শকুনের শরীরে কোনো অ্যানজাইম নেই। বরং ডাইক্লোফেনাকই তাকে ধ্বংস করে দেয়। এই ওষুধ শকুনের পেটে গেলে এক-দুই দিনের মধ্যেই সেটি মারা যায়। বিষয়টি বিশেষজ্ঞরা বুঝে ওঠার আগেই পৃথিবী থেকে শকুন বিলুপ্তির পথে। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ অব ভেটেরিনারি মেডিসিনের গবেষক ড. লিন্ডসে ওক তার এক গবেষণায় এটি প্রমাণ করেন।

তবে যখনই বুঝতে পেরেছেন এই দুই ওষুধ দেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পৃথিবীর অনেক দেশেই পশু চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনাকের পরিবর্তে সমান কার্যকর, অথচ শকুনবান্ধব ‘মেলোক্সিক্যাম’ নামক ওষুধ ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

বাংলাদেশে ২০১০ সালে সারাদেশে শকুনের জন্য ক্ষতিকারক ডাইক্লোফেনাক নিষিদ্ধ করে সরকার। আর ২০১৭ সালে কিটোপ্রফেন দুইটি অঞ্চলে বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়। ২০১৩ সালে শকুন সংরক্ষণের জন্য দেশে করা হয়েছে জাতীয় কমিটি। ২০১৪ সালে দেশের খুলনা ও সিলেট অঞ্চল শকুনের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

শকুনকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম শনিবার আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস পালিত হয়ে থাকে।

ভয়েস টিভি/এসএফ
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/49762
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2021 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ