Printed on Fri Aug 06 2021 4:28:44 AM

ঈদের ছুটিতে কোমল পানীয়!

লাইফস্টাইল ডেস্ক
ভিডিও সংবাদলাইফস্টাইল
ঈদের
ঈদের
ঈদ মানেই সারাদিন অতিরিক্ত খাওয়া-দাওয়া। ভারি খাবারের পর তাই কোল্ড ড্রিংকস না খেলেই নয়। আর তাছাড়া বাংলাদেশের দু:সহ গরমে মাঝেমধ্যে ঠান্ডা কোমল পানীয় বা এনার্জি ড্রিংকস না খেলে শরীর যেন আর চলতেই চায় না। বিয়ে-শাদি বা যে কোনো অনুষ্ঠানে ঠান্ডা পানীয় থাকবে না এ কথা এখন কল্পনাই করা যায় না। আর এখন তো কোমল পানীয় বা এনার্জি ড্রিংকস খাওয়া আমাদের তারুণ্যের ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমরা অনেকেই জানি না সফট ড্রিংকস বা কোমল পানীয় আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য কত ক্ষতিকর। করোনার এই দু:সময়ে তো কোল্ড ড্রিংকসের চেয়ে গরম চা বা কফি পান করাটাই বেশি স্বাস্থ্যসম্মত। প্রতিদিন মানুষ খেয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সফট ড্রিংকস বা কোমল পানীয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এনার্জি ড্রিংকস। নানা রকম প্রলোভন আর চাকচিক্যময় বিজ্ঞাপনের হুজুগে এগুলো বিক্রিও হচ্ছে দেদারছে।

বিয়ে বা কোনো উৎসবে ভরপেট খাওয়ার পর মহানন্দে কোমল পানীয় পান না করলেই নয়। সবচেয়ে হাস্যকর বিষয় হচ্ছে, অধিকাংশেরই ধারণা এতে খাবারটা ভালো হজম হবে। খাবার সবচেয়ে ভালো হজম হয় যখন পাকস্থলীর তাপমাত্রা থাকে ৩৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। এ তাপমাত্রায় পাকস্থলীর এনজাইম বা পাচক-রস খাবার হজমের জন্যে সবচেয়ে উপযোগী অবস্থায় থাকে। কিন্তু ভরপেট খাওয়ার পরই যখন পাকস্থলীতে শূন্য থেকে চার ডিগ্রি তাপমাত্রার কোমল পানীয় ঢেলে দেয়া হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই হজমের পুরো প্রক্রিয়াটি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হজমের বদলে তখন পাকস্থলীতে থাকা খাবার গাঁজন প্রক্রিয়ায় পঁচতে শুরু করে। কোমল পানীয় পানের কিছুক্ষণ পর খাবার হজমের লক্ষণ মনে করে সবাই যে তৃপ্তির ঢেঁকুরটি তোলে, তা আসলে খাবার হজমের নয় বরং পচনের ফলে সৃষ্ট গ্যাস।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে কোমল পানীয়ে রয়েছে ইথিলিন গ্লাইকল, কৃত্রিম রঙ, ফসফরিক এসিড, বেশি মাত্রার ক্যাফেইন, ঘনচিনি, অপিয়েট ও সিলডেনাফিল সাইট্রেট-এর মতো ক্ষতিকর উপাদান। যার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ।

চিকিৎসকদের মতে, বিশ্বজুড়ে গত কয়েক দশকে সব বয়সী বিশেষত শিশুদের মধ্যে কিডনি রোগ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো এই কোমল পানীয়। এনার্জি ড্রিংকস পুরুষদের ক্ষেত্রে যৌনশক্তি হ্রাস, সন্তান জন্মদানে অক্ষমতা, হৃদরোগ ঝুঁকি বাড়াতে পারে। আর নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভপাত ও দুর্বল শিশু জন্ম দেয়ার মতো দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষনা মতে, সিলডেনাফিল সাইট্রেট মেশানো পানীয় পর্যায়ক্রমে পুরুষত্ব নষ্ট করে ফেলবে। হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে লিভার ও কিডনি।

ফ্রিজে চার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বা তার কম তাপমাত্রায় কোনো তরল দীর্ঘক্ষণ রাখলে তা জমে বরফ হয়ে যায়। কিন্তু কোমল পানীয় ও এনার্জি ড্রিংকসের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে না। কারণ এগুলোতে এন্টি-ফ্রিজার হিসেবে মেশানো হয় এই ইথিলিন গ্লাইকল। এটি মানবদেহের জন্যে স্বল্প মাত্রার আর্সেনিকের মতোই একটি বিষ।

কোমল পানীয় ও এনার্জি ড্রিংকসে মেশানো হয় কিছু কৃত্রিম রঙ। যেমন টারট্রাজিন, কারমোসিন, ব্রিলিয়ান্ট ব্লু, সালফেট ইয়েলো ইত্যাদি। নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে এগুলোর বিক্রয় নিষিদ্ধ। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এ উপাদানগুলো ক্যান্সার সৃষ্টির কারণ।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রচলিত পানীয়গুলোতে প্রতি লিটারে ক্যাফেইনের পরিমাণ সর্বোচ্চ ৫০ মিগ্রা, সেখানে আমাদের দেশের পানীয়গুলোতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে পাঁচগুণ। এমনকি কোনো কোনোটাতে তারও বেশি পরিমাণ ক্যাফেইন পাওয়া গেছে। এছাড়াও এসব কার্বোনেটেড পানীয়ে ব্যবহৃত হয় সিনথেটিক ক্যাফেইন, যা আরো ভয়াবহ।

আমরা অনেক ক্ষেত্রেই পশ্চিমা বিশ্বকে আমাদের অগ্রপথিক মনে করি কিন্তু আমরা সবাই কি জানি, আমেরিকা ও কানাডার অধিকাংশ স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে কামল পানীয় বা এনার্জি ড্রিংকস বিক্রয়ের মেশিন বাধ্যতামূলক ভাবে অপসারণ করা হয়েছে। অনেক ক্যাম্পাসে কামল পানীয় বা এনার্জি ড্রিংকস বিক্রিও নিষিদ্ধ।

পাশের দেশ ভারতে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় কয়েকটি বিশ্ববিখ্যাত কোম্পানির কোমল পানীয় বা এনার্জি ড্রিংকসে অত্যধিক মাত্রায় কীটনাশক পাওয়ায় মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট ও কেরালায় এসব পানীয় বিক্রি নিষিদ্ধও করা হয়। ভারতে কোমল পানীয় বা এনার্জি ড্রিংকসের ওপর উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। এসব পানীয় যে ক্ষতিকর নয়, তা ওইসব কোম্পানিকে প্রমাণ করতে বলা হয়েছে। চিনির মাত্রাধিক্যের কারণে সিঙ্গাপুর সরকার সকল ধরনের কোমল পানীয় স্কুল পর্যায়ে বিক্রি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

একেবারেই হাইলি কোনো উপাদান না থাকলেও কোমল পানীয়তে কোক মিক্সার বা পাউডার , সোডা, ফেভার, আনুপাতিক পরিমাণ স্যাকারিন, কীটনাশক, ক্যাফেইন, রঙ, পানি ইত্যাদি ন্যুনতম হলেও মেশানো থাকে, যা শরীরের জন্য সম-পরিমান ক্ষতিকর।

কোনো তরল কতটা এসিডিক হবে তা নির্ভর করে তার pH মানের ওপর। যে পানীয়ের pH মান যত কম সে পানীয় তত এসিডিক। কোনো পানীয়ের pH মান ৫.৫ বা তার কম হলে সে পানীয় শরীরের জন্যে ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হয়। এর সঠিক মাত্রা না থাকলে শরীরে ক্রমান্বয়ে জমা হতে থাকা এই এসিড দাঁত ও হাড়সহ শরীরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতিসাধন করে। আমাদের দেশের বেশিরভাগ পানিয়তেই এর উপস্থিতি থাকে সর্বোচ্চ ৩.৩ অনুপাতে।

গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত ক্যাফেইন গর্ভপাত, নির্দিষ্ট সময়ের আগেই প্রসব, কম ওজনের সন্তান প্রসব ও গর্ভস্থ শিশুর জন্মগত ত্রুটি ঘটানোর মতো জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়াও মূত্রাশয় ও পাকস্থলীর ক্যান্সারসহ কমপক্ষে ছয় ধরনের ক্যান্সার ও উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম কারণ এই অতিরিক্ত ক্যাফেইন। পাকস্থলীর ভেতরের আবরণের ওপরও রয়েছে ক্যাফেইনের ক্ষতিকর প্রভাব।

কোমল পানীয়ের আরেকটি উপাদান হলো কার্বন-ডাই-অক্সাইড, যা আমরা শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় শরীর থেকে বর্জ্য হিসেবে বের করে দিই। অথচ কোমল পানীয় পানের মাধ্যমে এটি শরীরে প্রবেশ করে।

গত কয়েক দশকে সারা বিশ্বে এসব রোগে অকালমৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ার একটি সাধারণ কারণ হিসেবে কোমল পানীয়ের উল্লেখ্যযোগ্য ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন স্বাস্থ্য-গবেষকরা।

তাই বলে যে সফট ড্রিংক খাওয়া বন্ধ করে দিতে হবে এমনটা অবশ্যই নয়। ঘরে বানানো প্রিজারভেটিভ ও ক্যামিক্যালমুক্ত ফলের জুস বাজারে কেনা রঙিন ও মজাদার জুস ও ড্রিংকসের চেয়ে অনেক বেশি মানসম্মত ও পুষ্টিকর। শিশুদের যদি ঘরে বানানো জুসের প্রতি আকৃষ্ট করা যায় তাহলে দেহের সঠিক বৃদ্ধি ও পুষ্টি দুটোরই সমন্বয় ঘটানো সম্ভব। ক্লান্তি দূরেও ঘরে বানানো জুসের তুলনা নেই।

ভয়েস টিভি/এএস
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/49106
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2021 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ