Printed on Sat Jul 31 2021 6:05:21 AM

গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙাল হরিনাথ মজুমদার

রনজক রিজভী
জাতীয়
গ্রামীণ সাংবাদিকতার
গ্রামীণ সাংবাদিকতার
গ্রামীণ সমাজের নব জাগরণ ও সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙাল হরিনাথ মজুমদার। ঊনবিংশ শতাব্দির কালজয়ী সাধক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও নারী জাগরণের অন্যতম দিকপাল তিনি। তৎকালে ইংরেজ নীলকর, জমিদার, পুলিশ ও শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে হাতে লেখা পত্রিকা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন নিপীড়িত মানুষের পাশে। তাঁর গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা গ্রামীণ-স্বার্থ সংরক্ষণে অল্পদিনেই অধিকার বঞ্চিত মানুষের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। কৃষক-তাঁতী-রায়ত-প্রজা ও শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণকর পত্রিকাটির ভূমিকা এ বাঙলায় আজও দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। আদর্শ সাংবাদিকতা এবং পল্লীবাসীর সঙ্গে মিশে থাকা এই মুখপাত্রটি এখন শুধুই ইতিহাস।

অত্যাচার ও জলুমের বিরুদ্ধে কাঙাল হরিনাথ এবং তাঁর পত্রিকা ছিল আপোষহীন। তিনি ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার ও সামাজিক কু-প্রথার বিরুদ্ধে লিখে নির্ভিক সাংবাদিকতার বিকাশ ঘটানোর প্রত্যয় গ্রহণ করেন। এই ধারাবাহিকতায় ১২৭০ সালের পহেলা বৈশাখ প্রাচীন জনপদ কুমারখালীর নিভৃত গ্রাম থেকে হাতে লিখে প্রথম প্রকাশ করেন মাসিক গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা। হাজারো বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে তিনি এ পত্রিকাটি প্রায় এক যুগ প্রকাশ করেছিলেন। মাসিক থেকে পাক্ষিক এবং পরবর্তীতে ১৮৬৩ সালে সাপ্তাহিক আকারে কলকাতার গিরিশচন্দ্র বিদ্যারত্ন প্রেস থেকে নিয়মিত প্রকাশ করেন। ১৮৭৩ সালে হরিনাথ মজুমদার সুহৃদ অক্ষয় কুমার মৈত্রের বাবা মথুরানাথ মৈত্রের আর্থিক সহায়তায় কুমারখালীতে এমএন প্রেস স্থাপন করেন এবং সেখান থেকেই গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকার প্রকাশনা অব্যাহত রাখেন। এই খ্যাতিমান সাধক পুরুষ কুষ্টিয়ার কুমারখালী শহরের কুণ্ডুপাড়ায় (তদানিন্তন পাবনা জেলার নদীয়া) ১২৪০ সালের ৫ শ্রাবণ (ইংরেজী ১৮৩৩) জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা হলধর মজুমদার এবং মা কমলিনী দেবী। তিনি ছিলেন মা-বাবার একমাত্র সন্তান। তাঁর জন্মের পর শৈশবেই মাতৃ ও পিতৃবিয়োগ ঘটে। এরপর দারিদ্রের বাতাবরণে বেড়ে উঠতে থাকেন কাঙাল হরিনাথ। তাঁর ৬৩ বছরের জীবনকালে তিনি সাংবাদিকতা, আধ্যাত্ম সাধনাসহ নানা সামাজিক আন্দোলন এবং কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এই কালজয়ী সাধকপুরুষ ও সু-সাহিত্যিক বাংলা ১৩০৩ সালের ৫ বৈশাখ (১৮৯৬ সাল, ১৬ এপ্রিল) কুণ্ডুপাড়ার নিজ বাড়িতে দেহত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তিনি রেখে যান তিন পুত্র, এক কন্যা এবং স্ত্রী স্বর্ণময়ীকে। গ্রামীণ সাংবাদিকতা এবং দরিদ্র কৃষক ও সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের একমাত্র অবলম্বন কাঙাল হরিনাথের স্মৃতি বর্তমানে হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ তিনি ছিলেন একজন জীবন সংগ্রামী সাধক ও আলোকজ্জ্বল মানুষ।

কাঙাল হরিনাথ নিজেই গ্রামগঞ্জ ঘুরে সংবাদ সংগ্রহ করতেন এবং পাঠকদের হাতে তুলে দিতেন একটি বলিষ্ঠ পত্রিকা। সাহসী এ কলম সৈনিক ১৮৭২ সালে দুঃখী মানুষের পক্ষে অবস্থান নেন। এরপর থেকে কালা কানুনের বিরুদ্ধে পত্রিকার মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবাদ জানান। তিনি গ্রামে বসবাস করেও ১৮৬৩ সালে নীলকর সাহেব এবং শিলাইদহের জোড়া সাঁকোর ঠাকুর জমিদারের বিরুদ্ধে প্রবন্ধ লিখে তোলপাড় সৃষ্টি করেন। একারণে ঠাকুর জমিদার ঊনিশ শতকের এই বুদ্ধিজীবীকে খুন করতে ভাড়াটে লাঠিয়াল পাঠান। কিন্তু বাউল সাধক লালন ফকির তাঁর দলবল নিয়ে পল্লীবন্ধু কাঙালকে রক্ষায় কাঙাল কুঠিরে অবস্থান নেন। এতে তীব্র প্রতিরোধের মুখে জমিদার লাঠেলরা ফিরে যায়। লালন ফকিরের সঙ্গে কাঙালের যোগাযোগ থাকার কারণেই তিনি রক্ষা পান।

অত্যাচার জুলুম নিপীড়নের বিরুদ্ধে সবসময়ই সোচ্চার ছিলেন কাঙাল হরিনাথ। এর পাশাপাশি তিনি গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকাকে ঘিরে গড়ে তোলেন লেখক গোষ্ঠী। ফলে এ পত্রিকার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সু-সাহিত্যিক রায় বাহাদুর জলধর সেন, দীনেন্দ্র কুমার রায়, মীর মশাররফ হোসেন,শিবচন্দ্র বিদ্যানর্ব প্রমুখ সাহিত্যিক। এছাড়া দেড়শো বছর আগে সাহিত্য আড্ডা বসিয়ে তিনি যে জ্ঞানের দ্বীপ জ্বেলেছিলেন তা ছিল অনন্য এক দৃষ্টান্ত। সে-সময় ওই আড্ডায় নিয়মিত সময় দিতেন মীর মোশাররফ হোসেন, অক্ষয় কুমার মৈত্র ও বাউল সম্রাট লালন ফকির। বাঙলা সাহিত্যের কবি ঈশ্বর গুপ্ত এবং কাঙাল হরিনাথের ভূমিকা সম্পর্কে বলা হয়েছে, কবি ঈশ্বর গুপ্ত রাজধানী কলকাতার বৃহত্তর গুণী সমাজে অবস্থান করেও প্রাচীন ও আধুনিক যুগের সন্ধিক্ষণে তিনি রক্ষণশীল মনোভাব পোষণ করেছেন। অথচ কাঙাল হরিনাথ কুষ্টিয়ার কুমারখালীর মতো একটি ছোট শহরে বাস করেও তার চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক, উদার, নির্ভিক ও যুক্তিপূর্ণ মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু উপযুক্ত মূল্যায়ন এবং প্রচারের অভাবে তিনি কাঙাল ভনিতায় বাউল গান রচনাকারী হিসেবেই রয়ে গেছেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি বাউলসাধক ছিলেন না। তিনি ছিলেন উদার হৃদয়ের সাধক পুরুষ ও সাহিত্যিক। এ কারণে কেউ-কেউ তাকে ব্রহ্ম ধার্মাবলম্বীও মনে করতেন।

গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা ছিল নিতান্তই নির্ভীক সাংবাদিকতার আদর্শ পত্রিকা। পাবনার তৎকালীন জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মি. হামফ্রে কাঙাল হরিনাথ মজুমদারকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন- "এডিটর, আমি তোমাকে ভয় করি না বটে, কিন্তু তোমার লেখনির জন্য অনেক কুকর্ম পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছি"। এই উক্তির পেছনে যে কারণটি ছিল, তা হলো- এক দুঃখীনী মায়ের গরু ছিল খুবই লোভনীয়। তৎকালীন জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের গরুটি দেখে পছন্দ হয়ে যায়। পরে তারই নির্দেশে গরুটি ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে এ ঘটনা জানতে পারেন সাংবাদিক কাঙাল হরিনাথ। তিনি গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকায় গরুচোর ম্যাজিষ্ট্রেট শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করেন। সংবাদ দেখে ম্যাজিষ্ট্রেট খুবই রাগান্বিত হয়ে ছুটে এলেন হরিনাথের প্রেসে। সে সময় হরিনাথ ছিলেন কুামরখালী শহরের উত্তর-পূর্ব দিকে বাটিকামারা গ্রামের ঝড়েপুল খ্যাত জঙ্গলের মাঝে কালিমন্দিরে ধ্যানমগ্ন। ম্যাজিষ্ট্রেট ঘোড়ায় চড়ে চাবুক নিয়ে ছুটলেন সেখানে। কাঙাল হরিনাথকে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় দেখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর কয়েকবার ডাকেন। কথিত আছে, কোনো সাড়া না পাওয়ায় তিনি চাবুক মারেন। অথচ একটিবারও কাঙালের পিঠে চাবুক স্পর্শ না করায় ম্যাজিষ্ট্রেট হতবিহ্বল হয়ে পড়েন এবং ফিরে যান। ম্যাজিষ্ট্রেট তার দূর্ব্যবহারের জন্যে পরে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলেন বলেও শোনা যায়। এ ঘটনাটি আজও সনাতন মতাদর্শিদের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রচার রয়েছে।

কাঙাল হরিনাথ শৈশবে বাবা-মা হারিয়ে চরম দারিদ্রতার মধ্যে সামান্য লেখাপড়া শিখতে সক্ষম হন। অবস্থা সম্পন্ন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও কিশোর বয়সেই তাকে জীবন সংগ্রামের মুখোমুখি হতে হয়। কর্মজীবনের শুরুতেই তিনি দু’পয়সা বেতনে কুমারখালী বাজারের একটি কাপড়ের দোকানে চাকুরি নেন। দিনের বেলায় খরিদ্দারের তামাক-সাজা, কাপড়-গোছানো এবং সন্ধ্যায় তিনি দোকানের খাতা লেখার কাজ করতেন। এরপর কিছুদিন মহাজনের গদিতে খাতা লেখা, ৫১টি কুঠির হেড অফিস কুমারখালীর নীলকুঠিতে শিক্ষানবিশ হিসেবে চাকুরি এবং পরে শিক্ষকতার কাজ করেন। নানা অত্যাচার, অনাচার সইতে না পেরে তিনি কোনো চাকুরিই কয়েকদিনের বেশি করতে পারেননি। এরপর ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্তের সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় স্থানীয় সংবাদদাতা হিসেবে ইংরেজ জমিদারদের অত্যাচারের কাহিনী লিখে পাঠাতে শুরু করেন। ১৮৫১ সালে হরিনাথ প্রথম উপন্যাস গ্রন্থবিজয় বসন্ত প্রকাশ করেন। ১৮৫৪ সালের ১৩ জানুয়ারি তিনি কুমারখালীতে একটি বাংলা স্কুল স্থাপন করেন। এখানে তিনি অবৈতনিক শিক্ষকতার চাকুরি করেন এবং ইংরেজি শিক্ষার পদ্ধতি অনুসারে সেখানে পাঠদান করতেন। অল্পদিনেই বিদ্যালয়ের সুনাম ছড়িয়ে পড়লে ক্রমেই ছাত্র সংখ্যা বাড়তে থাকে। এরপর বিদ্যালয়টি সরকারের অনুদান প্রাপ্ত হয়। প্রধান শিক্ষক হিসেবে কাঙাল হরিনাথের বেতন নির্ধারিত হয় ২০ টাকা। তবে তিনি নিম্ন শ্রেণিস্থ শিক্ষকদের বেতন বাড়াতে নিজে পনেরো টাকা বেতন গ্রহণ করেন। পরে তিনি মেয়েদের শিক্ষাদানের জন্যে ১৮৬০ সালে কুমারখালীতে নিজ বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপগৃহে একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। রক্ষনশীল হিন্দুসমাজ যখন নারী-প্রগতি ও স্ত্রী শিক্ষার বিপক্ষে, হরিনাথের সাহিত্য ও সাংবাদিকতার গুরু কবি ঈশ্বর গুপ্তও যখন এর বিরোধী ছিলেন, তখন হরিনাথ কুমারখালীর পল্লীতে স্ত্রী শিক্ষায় ব্রত হয়েছিলেন। সেই বিদ্যালয়টিই এখন কুমারখালীর সুনামধন্য বালিকা বিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

লালন প্রভাবে কাঙাল হরিনাথ অসংখ্য বাউল গান রচনা করেছেন। তিনি বাউল গান রচনাকারী হিসেবে অনেকটাই স্বার্থক। তবে লালন ফকির একবার তার বাউল গান শুনে বলেছিলেন, এতে নুন কম হয়েছে। এরপর থেকে তিনি আরও সচেতন হয়ে গান রচনা অব্যাহত রাখেন এবং ফিকিরচাঁদ নামে গানের দল গঠন করেন। কাঙালের রচিত গান শুনে তৎকালীন বহু লোককে আবেগে অশ্রু বিসর্জন করতে দেখা গেছে বলে জনশ্রুতি আছে। এ সম্পর্কে সুকুমার সেন বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের আগে বাউল গান কাঙাল হরিনাথই সৃষ্টি করেছিলেন। তার বহু বাউল গান আজো গ্রামগঞ্জে বাউল শিল্পীদের কণ্ঠে প্রতিধ্বনীত হয়। তিনি নিজে বাউল না হয়েও বাউল গান রচনা করেছিলেন। তবে লালন সাঁই এর প্রচণ্ড প্রভাব মূলত কাঙালকে বাউল গান রচনা করতে সহায়তা করেছিল। লালন সাঁই বহুবার কুমারখালীর কাঙাল কুটিরে গেছেন। কাঙালও লালন শাহের ছেউড়িয়া গ্রামের আখড়াবাড়িতে এসেছেন। এর দলিলসহ প্রমাণাদী প্রকাশ করেছেন বরেণ্য গবেষক ডক্টর আবুল আহসান চৌধুরী। তিনি কাঙাল হরিনাথের জীবনীমালা গ্রন্থ এবং লালন সাঁইয়ের সন্ধানে বইয়ে এ সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। তার জীবনীমালা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- হরিনাথ বাউলগানের একটি ঘরাণা সৃষ্টি করেছিলেন। কাঙাল হরিনাথের বাউলাঙ্গের গান রয়েছে প্রায় হাজারের কোটায়। তাঁর গান শুনে তৎকালে অনেকে হরিনাথ দেবতাও বলতেন। বাঙলা ১২৮৭ সালে ফিকিরচাঁদ ফকিরের বাউলগানের দল গঠন করেন তিনি। এই দলের গান শুনতে এবং নিজে গান করতে কাঙাল কুটিরে আসতেন লালন ফকির। এতে ফিকিরচাঁদ দলের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে এবং বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ এই বাউলগান শুনতে আসতেন।

মানব দরদী, উদার ও অসম্প্রদায়িকতার প্রতিকৃৎ কাঙাল হরিনাথ এবং বাউল সম্রাট লালন ফকির। এদের হরিনাথ নিষ্ঠাবান সাংবাদিক হিসেবে বিশেষভাবে আলোচিত। তাঁর মতো একজন অতি সাধারণ দরিদ্র লোক এতোটা নির্ভিকভাবে পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে জনসেবা ও সাহিত্য সাধনা করে গেছেন- তা একালে খুব কমই দেখা যায়। তবে লালন ফকিরের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার নিদর্শন হিসেবে সাধন এবং বাউল গান রচনায় বিশেষ প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। একদিকে রবীন্দ্রসমুদ্র, অন্য দিকে কাঙাল হরিনাথ, লালন ফকির এবং মীর মশাররফের ত্রিভূজ আকার অবস্থান সাহিত্য সাধনা এবং আদান প্রদানের এক তরঙ্গ বিশ্লেষিত হয়। সৃষ্টির স্রোতও প্রবাহিত হয়েছে তীব্রতায়। যা দু’বাঙলার সাহিত্যে বিশেষ অবস্থান এই স্বীকৃতি দেয়।

বিশুদ্ধ-শিল্প প্রেরণার সাহিত্যচর্চায় ব্রত ছিলেন কাঙাল হরিনাথ। একই সঙ্গে তিনি বেশকিছু উত্তরসূরীও রেখে গেছেন। তাদের রচনা এবং কাঙালের রচনা আজও বাঙলা সাহিত্যে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হয়ে আছে। তবে কাঙালের সৃষ্টি, চর্চা এবং দর্শনের বিভিন্ন দিক এখনও অনাবিস্কৃত রয়ে গেছে। কাঙালের প্রকৃতপক্ষে ধর্মচিন্তা কী ছিল কিম্বা তিনি ব্রহ্ম সমাজী ছিলেন কিনা। এই সহজ ব্যাপারটিও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে এইটুকু জানা যায়, ব্রাহ্ম সমাজিদের সঙ্গে তাঁর গভীর ঘনিষ্ঠতা ছিল। কারো কারো ধারণা- হরিনাথ প্রথম জীবনে ব্রহ্ম সমাজী এবং শেষ জীবনে এসে হিন্দু মতে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন। ব্রাহ্ম-প্রচারক বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর সঙ্গে কাঙালের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল বলেও তার লেখাতেই এর প্রমাণ মেলে। তবে স্পষ্টভাবে এর প্রমাণ না মিললেও শেষজীবনে এসে তিনি ধর্মীয়চেতনা এবং সাধনতত্ত্বে আত্মমগ্ন হয়েছিলেন। এই তান্ত্রিক সাধক পুরুষের শিক্ষাজীবন ছিল খুবই সীমিত। গুরু মশাইয়ের কাছে শিক্ষাগ্রহণে উদাসীন কাঙাল হরিনাথ শিক্ষা নিতেন প্রকৃতি থেকে। বন্ধনহীন উদ্দমতায় কাটতে থাকে তার বাল্যকাল। পরে কুমারখালীতে ইংরেজী স্কুল প্রতিষ্ঠা হলে সেখানে ভর্তির পর অর্থাভাবে তা বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনি বাঙলা পাঠে ছিলেন ভীষণ পটু। এতে আত্মীয়রা লেখাপড়া শেখানোর ব্যাপারে মনোযোগী ছিলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত তা আর সম্ভব হয়নি। তাঁর জীবনের সবসময়ই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এই সাধক সংগ্রামের মাধ্যমে পার করেছেন জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত। তবে তাঁর গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা পত্রিকাটি ছিল গ্রামীণ মানুষের আশা-আকাঙ্খার প্রতীক। কৃষক-প্রজা-রায়ত-শ্রমজীবী এবং মধ্যবৃত্তের মানুষের সবচেয়ে বেশি আনুকূল্য পেয়েছিল তার এই পত্রিকা। পাশাপাশি অসহায় মানুষের একমাত্র আশ্রয় ছিলেন কাঙাল হরিনাথ। স্বদেশ শিল্প-বাণিজ্য বিকাশের এক পুরধাও ছিলেন তিনি। এই মহান ব্যক্তিত্ব সংগ্রামী জীবনের অনেক দূর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বাংলা ১৩০৩ সালের ৫ বৈশাখ (১৮৯৬ সাল, ১৬ এপ্রিল) কুমারখালী শহরের কুণ্ডুপাড়া গ্রামের নিজ বাড়িতে দেহত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তিনি তিন পুত্র, এক কন্যা এবং স্ত্রী স্বর্ণময়ীকে রেখে ৬৩ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন। ঊনিশ শতকে কুষ্টিয়ায় কাঙালের মতো এমন কৃতি পুরুষ আর দ্বিতীয়টি ছিলেন না। কুমারখালীতে একদিন কাঙাল হরিনাথ যে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর তা নিভে যায়।

কাঙাল হরিনাথ মজুমদার শুধু একজন সফল সাংবাদিকই ছিলেন না। তিনি কবিতা, উপন্যাস ও শিশুদের জন্য পাঠ্য পুস্তকও লিখেছেন। এছাড়া রচনা করেছেন নাট্যগ্রন্থ ও বিভিন্ন প্রবন্ধ গ্রন্থ। বিভিন্ন গবেষকদের লেখা থেকে জানা যায়, হরিনাথ মাজুমদার ৪০টি গ্রন্থ’ রচনা করেছেন। এরমধ্যে মাত্র কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। অপ্রকাশিতই রয়েছে বেশির ভাগ। তাঁর গ্রন্থগুলোর মধ্যে বিজয় বসন্ত একটি সফল উপন্যাস। অনেকে মনে করেন এই উপন্যাসটিই বাঙলা ভাষায় লেখা প্রথম উপন্যাস। আর এর জনক কাঙাল হরিনাথ মজুমদার। টেকচাঁদ ঠাকুরের আলালের ঘরে দুলাল উপন্যাসটিও বাঙলায় প্রথম হিসেবে ধরা হয়। এ নিয়ে শিবনাথ শাস্ত্রী, রামতনু লাহিড়ী তৎকালীন বঙ্গ সমাজ গ্রন্থে কাঙাল হরিনাথ সম্পর্কে লিখেছেন- কুমারখালীর হরিনাথ মজুমদার প্রণীত বিজয় বসন্ত ও টেক চাঁদ ঠাকুরের আলালের ঘরে দুলাল বাংলার প্রথম উপন্যাস। তৎকালীন সময়ে বিজয়-বসন্ত পাঠক মহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছিল। কাঙাল হরিনাথের সাহিত্যগুণের মাঝেও পাওয়ায় যায় নানা কর্মকাণ্ড। এরমধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো- তিনিই প্রথম লালন ফকিরের গান নিয়ে বই লেখেন এবং গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকায় বাউল গান প্রকাশ করেন। তাঁর গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে- বিজয় বসন্ত (উপন্যাস ১৮৬৯), পদ্যপুণ্ডরীক (১৮৬২), দ্বাদশ শিশুর বিবরণ, চারুচরিত্র (১৮৬৩), কবিতাকৌমুদী (১৮৬৬), বিজয়া (১৮৬৯), কবিকল্প (১৮৭০), অক্রুরসংবাদ (গীতাভিনয় ১৮৭৩), সাবিত্রী (গীতাভিনয় ১৮৭৪), চিত্তচপলা (১৮৭৬), একলব্যের অধ্যাবসায়, ভাবোচ্ছাস (নাটক), কাঙাল ফিকিরচাঁদ ফকিরের গীতাবলী (১৮৮৭ ও ১৮৯৩), ব্রহ্মাণ্ডবেদ (ধর্ম ও সাধনতত্ত্ব প্রথম থেকে ৬ষ্ঠ খণ্ড), কৃষ্ণকালী-লীলা (১৮৯২), অধ্যাত্ম-আগমনী (সঙ্গীত ১৮৯৫), আগমনী (ধর্মীয় সঙ্গীত), পরমার্থ-গাথা (ধর্মীয় সঙ্গীত), মাতৃ-মহিমা (সাধনতত্ত্বের ইতিবৃত্ত ১৮৯৭), কাঙাল ফিকিরচাঁদ ফকিরের বাউলসঙ্গীত, কংসবধ, প্রভাসমিলন, নন্দবিদায়, পাষাণোদ্ধার, রামলীলা, শিববিবাহ, নিমাই সন্ন্যাস, প্রেম-প্রমীলা (উপন্যাস), জটিল-কিশোর (নাটক), শুম্ভ-নিশুম্ভ বধ, অশোক, মনুজ (কাব্য), ভারতোদ্ধার (প্রবন্ধ), সেবা ও সেবাপরাধ (প্রবন্ধ), ঠানদিদীর বৈঠক (কাহিনী প্রবন্ধ), তৃতীয় ভাগ শিশুশিক্ষার অর্থসংগ্রহ (শিশুপাঠ্য), শ্রীকৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম (নাম-কীর্ত্তণ), আনন্দময়ী মায়ের আগমনী আনন্দ-উৎসব (তত্ত্বসঙ্গীত), আত্মচরিত এবং হরিনাথ গ্রন্থাবলী। এছাড়া তাঁর বেশ কিছু অপ্রকাশিত রচনাবলীও রয়েছে। তবে কোনো-কোনো ক্ষেত্রে তিনি ছদ্মনামেও গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা এবং সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় লেখা ছেপেছেন।

কাঙাল হরিনাথ ছিলেন সত্য পরায়ন, সাহসী সাহিত্যিক ও পল্লী হিতৈষী দরিদ্রবন্ধু। এই সু-সাহিত্যিক পত্রিকা প্রকাশনার একটি পর্যায়ে এসে তন্ত্রসাধনায় মনোযোগী হন। জঙ্গল আবৃত নির্জ্জনতায় তিনি নিয়মিত ধ্যানমগ্ন থেকেছেন। তাঁর এই সাধনপীঠ ছিল কুমারখালী শহরের উত্তর-পূর্ব কোণে দুর্গাপুরের শেষাংশে বাটিকামারা গ্রামের একটি বিল্ববৃক্ষ তলে। জায়গাটি সাধনপীঠ দুর্গাবাড়ি নামে পরিচিত। তবে বর্তমানে কালীমন্দির হিসেবে সবাই জানে। জঙ্গল আবৃত ঝড়েপুলখ্যাত এই দুর্গাবাড়ির দিকে একসময় সাধারনের যাতায়াত ছিল না। এক পায়ে পথ ছিল। আর বাঘ এবং হিংস্র পশুর আস্তানা ছিল ওই এলাকায়। কুমারখালী বাসস্ট্যাণ্ড থেকে উত্তর দিকে কিছুদূর গিয়েই দুর্গাপুর হাইস্কুল। এরই ডান পাশ দিয়ে হাসিমপুর-মহেন্দ্রপুর গ্রামে যাওয়ার রাস্তা। এই এলাকাটিই একসময় ঝড়েপুল নামে পরিচিত ছিল। রাস্তাটিতে যেতে চোখে পড়বে একটি ছোট্ট সাঁকো। এরই ডান পাশে বড় পাঁকড় (অশোত) গাছের নিচে একটি কালীমন্দির। এটিই মূলত সেই সাধনপীঠ দুর্গাবাড়ি। যেখানে বহুকাল ধরে তন্ত্রসাধনা চলেছে। ওখানেই রাস্তার বাম পাশে গাজীর দরগা এবং দহ (জলাশয়)। রাস্তা ঘেঁসে গাজীর দরগাটি একটু উচুতে। এরই সামনে রাস্তার ডান পাশে একটি বিল্ব বৃক্ষ ছিল। যা দুর্গা দেবীর আসন হিসেবে প্রাচীন ভাবনা থেকে চলে আসছে। দুটি ধর্ম মতের মানুষের সম্প্রীতির বন্ধনে এখানে সাধনতীর্থ গড়ে উঠেছে কবে থেকে কেউ জানে না। তবে সবাই ভাবেন এখানে কিভাবে মানুষ এসেছে। কারণ এলাকাটি জঙ্গল আবৃত ভুতড়ে পরিবেশ ছিল। এতোটাই জঙ্গল ছিল- দিনেই কেউ ওই এলাকায় যেতো না। বতর্মানে বিল্ব বৃক্ষটি নেই। তবে মানুষের মুখে নানা কথার প্রচলন রয়েছে এবং সকল ধর্মমতের মানুষেরই আসন দুটির প্রতি বিশেষ দূর্বলতা লক্ষ্য করা যায়। কিছুকাল আগেও এ সব বিশ্বাসী মানুষের মানত করার হিড়িক পড়তো। কলা, দুধ, মুরগীসহ বিভিন্ন সামগ্রী দেয়া হতো ওই আসন দুটিতে। তবে ইদানিং কালীমন্দিরের আর্চনা হওয়ার কারণে কিছুটা যত্নে থাকলেও গাজীর দরগাটি অযত্নে এবং অরক্ষিত রয়েছে। অথচ একসময় জায়গা দুটিই খুব জমজমাট ছিল। কাঙাল হরিনাথ মাতৃ-মহিমা গ্রন্থে এই দুটি তীর্থস্থানের বর্ণনা করেছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন- “এই দুর্গাবাড়ি নিজ কুমারখালীতে নহে, বাজারের উত্তরপূর্ব্ব বাটিকামারা গ্রামে। যে রাজপথটি দুর্গাপুর গ্রামকে বামে রাখিয়া পূর্ব্বমুখ হইয়া পরে পাবনা-বর্ত্মের সহিত মিলিত হইয়াছে, উক্ত পথের উত্তরে গাজিরদহ নামে একটি দহ আছে। দহের উপরে গাজির দরগা, তাহার পর রাজপথ। রাজপথের দক্ষিণে বহুকালীয় একটি বিল্ববৃক্ষ। এই বৃক্ষমূলেই পূর্ণ ব্রহ্মশক্তি দুর্গাদেবীর আবির্ভাব! বিল্ববৃক্ষের পূর্বদিকে যে একটি বদরিকাবৃক্ষ আছে, তাহার মূলই ভৈরবের স্থান। ইনি হরি নামে বিখ্যাত। একারণে লোকে বদরিকামূলকে হরির আসন বলিয়া থাকে”। এই সাধনপীঠের পুরো বর্ণনা তিনি দিয়েছে। সেখান থেকেই জানা যায়- বিরাহিমপুর পরগনার এক কর্মচারী ৫ কাঠা জমি দুর্গবাড়িতে নিষ্কর দান করেছিলেন। এখানে কাঙাল হরিনাথ মজুমদার ছাড়াও নানা উৎপীড়নে পড়ে সাধন করেছেন- স্থানীয় নবীন প্রামাণিক, ভৈৗমিক উপধিকারী, চক্রবর্তী, বাগচী, রাধা-মদন মোহনজিউর সেবায়িত, কৃষ্ণচন্দ্র চক্রবর্তীর পূর্বপুরুষ মোহন্তদেব চক্রবর্তী, চণ্ডাল যাজক হরিধন চক্রবর্তী, কুরী জাতীয় এক কালীভক্ত, প্রশিদ্ধ ভট্টাচার্য্য, দ্বিজটা সন্ন্যাসী, গোস্বামী সোনাবন্ধু, নিমানন্দ ভট্টাচার্য্যসহ আরও অনেকে। সাধক সন্ন্যাসীরা এখানে বুনো ফল খেয়ে জীবন ধারন করতেন। তখন গৌড় নদী (গড়াই নদী) ছাড়া কোথাও পানি মিলতো না। ধারণা করা হয়- একারণে ঝড়েপুল এলাকায় জনবসতিও ছিল না। গাজীর দরগার সৃষ্টির আগে দুর্গাদেবীর আসন সৃষ্টি বলেই জানা যায়। তবে কেউ সঠিকভাবে বলতে পারেন না। মাতৃমহিমা সূত্রে জানা যায়, বিল্বমূলে সিদ্ধি লাভের পর এক ফকির দুর্গাবাড়ীতে গাজীর দরগা স্থাপন করেন। তখন পানি ছিল কুঠিরদীঘি এবং গৌড়ী নদীতে। তবে সেই ফকিরের সাধনায় দরগার উত্তরে রাতারাতি একটি দহ (জলাশয়) সৃষ্টি হয়। যা গাজীর দহ নামে পরিচিত। এই ঘটনার কারণে গাজীর দরগারও বেশ গুরুত্ব বেড়ে যায়। এরপর এখানে আসেন করিম শাহ ফকির নামে এক উলঙ্গ ফকির। সে এখানে ধানমগ্ন থেকেছে। জনশ্রুতি আছে তিনি কখনো নৌকায় নদী পার হয়নি। আপনা-আপনিই এপারে-ওপারে তাকে দেখা যেতো। হঠাৎ-ই তিনি একদিন উধাও হয়ে যায়। এরপর আসেন মহম্মদ শাহ ফকির। তিনি দরগার কিছুটা পাকা করেন। এরপর আসেন নবু ফকির। তিনি স্থানীয়। তিনি সাধক ছিলেন না। তবে তার স্ত্রী এবং মা গাজী ও দুর্গা দেবীর ভক্ত ছিলেন। সেসময় বড়–লিয়া গ্রামের এক যুবক পবন দুর্গাবাড়ি এলাকায় গরু চড়াতে আসতো। একদিন বাঘ তাকে তাড়া করে। সে দৌড়ে গাজীর দরগায় এসে উদ্ধার পায়। একথা তখন না বললেও পরে তা পাবন ফকির প্রকাশ করেন। এই দুটি তীর্থস্থান নিয়ে নানা কথার প্রচলন রয়েছে। যা কাঙাল হরিনাথও কিছু প্রকাশ করে গেছেন। ১৩০০ সালে দুর্গোৎসবে তিনি সেখানে সমুদয় দেবতারই দর্শন পেয়েছেন বলে প্রকাশ করেছেন। এরপরই কাঙাল হরিনাথ এবং ফারাতুল্যা ফকির দুর্গাবাড়িতে বলিদান নিষিদ্ধ করেন। এরপরও বলি দেয়ার পর পুরহিত মারা যান। এরই সঙ্গে সেখানে বলি দেয়া বন্ধ হয়ে গেছে।

সাধনপীঠে খুব ছোট বেলা থেকেই কাঙাল আসতেন। পরে যখন উৎপীড়নে ছুটে এসে দাঁড়ালেন দুর্গাবাড়ির পাশে এবং জানলেন এটি দুর্গাদেবীর আসন, অমনি ধ্যানমগ্ন হয়ে পড়েন। এই এলাকা সম্পর্কে ফার্নিচার শিল্পী ও ব্যবসায়ী শেখ মোহা. সেলিম এবং গৃহিনী হাসিনা খাতুন জানান, দুর্গাবাড়ি এলাকায় তিন বুড়ির ভিটা ছিল। এদের নাম মতিজান বুড়ি, উমরী বুড়ি এবং অন্যজনের নাম অজানা। দিন বাড়িই ছিল রাস্তার বাম পাশে। এই তিন বাড়ি ছাড়া কোনো বসতি ছিল না। তাদের পানি খাওয়ার একমাত্র ব্যবস্থা ছিল কুয়া। মতিজানের বাড়ি থেকে তারা পানি সংগ্রহ করতো। আর এই বুড়ি মারা গেছেন ১২৫ বছর বয়সে ২০০৪ সালে। তার মুখে শোনা, ঢোল বাজিয়ে ধুতি পড়ে কিছু লোক ঝড়েপুলের একপায়ে রাস্তা ধরে গান করে যেতো। অনেক রাতেও কালীবাড়িতে গান শোনা যেতো। ফাল্গুন মাসের তিথি অনুযায়ী শিবরাত্রিতে কালিপূজা হতো। পরবর্তীতে জ্যৈষ্ঠ মাসের ১৯ তারিখে লোকনাথ পূজাও হয়েছে। তবে ওখানে ভয়ে তারা (মতিজানরা) যেতেন না। তবে এলাকার প্রভাবশালী শিক্ষিত আবুল বিশ্বাস তার বন্ধু আজাহার এবং কাদের মোল্লারা আড্ডা দিতেন। হাছেন শোনাতেন কবিগান। ওসব নিয়ে তাদের তেমন ভাবনা ছিল না। সন্ধ্যায় তারা আবুল বিশ্বাসের বাড়িতে আড্ডা দিতেন। আর ২০০ গজ দূরে সাধন করতেন কাঙাল হরিনাথসহ অন্যান্যরা। মাঝ-মধ্যে তার ফিকিরচাঁদের দল নিয়ে গান হতো। আজাহারের বাবা ইসমাইলের সঙ্গে দুর্গাবাড়ির সাধকদের ভালো জানাশোনা ছিল বলে ধারণা করা হয়। ওই বাড়িতে চৌচালা ঘরে আসর বসতো এবং সবাইকে আউশ ধানের মুড়ি খাওয়ার ব্যবস্থা রাখতেন তিনি। কাঙাল হরিনাথের পদ (বাণী) যেখানে দেখিবে ছাই/ উড়াইয়া দেখ তাই/ পাইলেও পাইতে পার/ লুকানো রতন। পাঠ করা হতো বলেও শোনা যায়। কাঙালের এরকম আরো পদ রয়েছে- আমি বুঝি না হে তন্ত্র তন্ত্র/ শস্ত্র তর্ক বৃথা, তুমি আমার, আমি তোমার/ কাঙালের বেদ গাঁথা। এভাবে কাঙাল গানের বাণীতে তুলে ধরেছেন বাস্তবতা। পাশাপাশি- হরি দিনতো গেলো সন্ধ্যা হলো/ পার কর আমারে এবং আমি আছি কিরে নাই/ আগে ঠিক কর তাই/ পরে দেখবে আছেন তিনি/ ভাবতে কিছু হবে না, হবে না, এই গানের বাণীতে পার হওয়ার এবং নিজের অবস্থান নিয়ে বক্তব্য স্পষ্ট করেছেন। আবার এই সমসাময়িক বিষয়ও উঠে এসেছে তাঁর বাণীতে- সোনার বাঙ্গাল, ভাতের কাঙ্গাল/ চক্ষে দেখা নাহি যায়/ করে হাহাকার, কত পরিবার/ তৃণশাকে না কুলায়। এরকম নানা বাস্তবতাও উঠে এসেছে কাঙাল হরিনাথের বাণীতে। এই এলাকাটি ইষ্টইন্ডিয়া কোম্পানী, ওসয়ালদিগের পতঙ্গের কুঠি কিনে কাপড়ের কুঠি স্থাপন করে। এরপর রাস্তা নির্মাণের কারণে দুর্গাবাড়ি এবং গাজীর দরগা পৃথক হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকা থেকে জোলারা এসে বাটিকামারা গ্রামে বাসস্থান গড়ে তোলেন। অবশ্য, এখানে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছিল পাবনার সঙ্গে রেল সংযোগ করার জন্যে। ব্রিটিশদের পরিকল্পনা ছিল- কুমারখালী থেকে এই পথে পদ্মা পাড়ি দিয়ে রেল নিয়ে যাওয়া হবে পাবনায়। এলাকার আদি বাসিন্দা ইসমাইলের নাতি সোহরাব উদ্দিন ওরফে ছনে (৮৫) জানান, এক মেম সাহেবসহ অনেক বিশেষজ্ঞরা এসেছিলেন। তারা তখন খুব ছোট। মেম সাহেব বলেছিলেন, এই এলাকায় বারবার বন্যার পানি ঢুকবে। রেল লাইনের জন্য উপযোগী নয়। এরপর তারা সিদ্ধান্ত বদলান। প্রকৃতপক্ষে সেই মেম সাহেবের পর্যবেক্ষণই সঠিক ছিল। প্রায় প্রতিবছরই এই এলাকায় পানি ঢুকে পড়ে এবং বন্যা দেখা দেয়।

বর্তমানে আগের সেই পরিবেশ না থাকলেও তীর্থস্থান দুটির এলাকা এখনও লোকালয়ে ভরে উঠেনি। প্রাচীনকাল থেকেই প্রসিদ্ধ এই এলাকায় কোনো সাম্প্রদায়িক বিভেদ নেই। ব্রহ্মময়ী দুর্গা আচারের মর্মাজ্ঞরা কখনই সাম্প্রদায়িক বিভেদ-বৈষম্য গড়ে তুলবে না এই নির্দেশনায় এখনও টিকে আছে তীর্থস্থান দুটি। আর কালজয়ী সাংবাদিক ও তান্ত্রিক সাধক কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের স্মৃতিও সবার অগোচরে মিশে আছে।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী
rizvynca@gmail.com
www.ranjakrizvy.com
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/48024
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2021 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ