Printed on Thu Jun 30 2022 7:32:55 PM

চাঁদপুরে নদীতে অবৈধ বালি উত্তোলন বন্ধের দাবি সেলিম এন্টারপ্রাইজের

নিজস্ব প্রতিবেদক
সারাদেশ
চাঁদপুরে নদীতে
চাঁদপুরে নদীতে
চাঁদপুর জেলাজুড়ে এখন ব্যাপক আলোচিত বিষয় হচ্ছে নদী থেকে বালু উত্তোলন। এ উত্তোলন বৈধ কি অবৈধ সেটিই আলোচনার বিষয়বস্তু। যদিও এই বালু উত্তোলন ২০০২ সাল থেকে হয়ে আসছে। তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। সেই তখন থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত টানা ১৯ বছর চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠি বালু উত্তোলন করলেও প্রশাসন বা কোনো মহল থেকে টু শব্দ পর্যন্তও করা হয়নি। এই সময় তথা এই দুই আড়াই মাস এটা নিয়ে বেশ সোচ্চার দেখা যাচ্ছে প্রশাসনকে। তবে প্রশাসনের এই সোচ্চার হওয়াকে জনগণ একটা দিক দিয়ে স্বাগত জানাচ্ছে যে, নদীতে অবৈধ এবং অপরিকল্পিত ড্রেজিং যেনো চলতে না পারে। অবৈধ এবং নির্দিষ্ট এরিয়ার বাইরে ড্রেজিং হলে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন স্বউদ্যোগী হয়েই অভিযান চালাতে পারে, এ ক্ষেত্রে কোনো সংস্থার অনুমতি লাগে না বলে মনে করেন সচেতন মহল।

এদিকে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় নদীতে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালু উত্তোলন বিষয়ে ঢাকায় নদী রক্ষা কমিশনের উচ্চ পর্যায়ের এক সভা অনুষ্ঠিত হয় গত সোমবার। কয়েকটি গণমাধ্যমের সূত্রে জানা গেছে, চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিসের আবেদনের প্রেক্ষিতে এই সভা আহ্বান করা হয়। সভায় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের নতুন চেয়ারম্যান ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী ছাড়াও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং চাঁদপুরের জেলা প্রশাসকও উপস্থিত ছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ এ সভায় চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা থেকে বালু উত্তোলন সংক্রান্ত সকল কাগজপত্র এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনার বিষয়সহ সব যাচাই ও বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, সভায় সকল কিছু পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়, নদীর নাব্যতা রক্ষার্থে চাঁদপুরের পদ্মা মেঘনা থেকে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে যে বালু উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, একইসাথে উচ্চ আদালতের যে নির্দেশনা রয়েছে, তার বাইরে কোনো ড্রেজিং চলছে কি না এবং লাইসেন্সবিহীন কোনো অবৈধ ড্রেজার নদীতে আছে কিনা তা স্থানীয় প্রশাসন দেখবে। তা যদি থেকে থাকে তাহলে প্রশাসন অবশ্যই সেখানে অভিযান চালিয়ে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট এরিয়ার বাইরে চলা ড্রেজিং এবং অবৈধ কোনো ড্রেজার চললে সেগুলো জব্দসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে প্রশাসন।

এদিকে সোমবার এমন সিদ্ধান্ত হলেও বুধবার পর্যন্ত প্রশাসনকে নদীতে এ ধরনের কোনো অভিযান করতে দেখা যায়নি এবং এ সংক্রান্ত কোনো তথ্যও কোনো মহল থেকে জানা যায়নি। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজসিল গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নদী কমিশনের নির্দেশনা পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে গত সোমবার নদী রক্ষা কমিশনের সভার সূত্র ধরে কথা হয় মেসার্স সেলিম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মোঃ সেলিম খানের সাথে। তার কাছে জানতে চাওয়া হয় তিনি যে নদী থেকে বালু উত্তোলন করছেন তার বৈধতা কি এবং কোন সময় থেকে তিনি বালু উত্তোলনের কাজটি করছেন। এর জবাবে সেলিম খান বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, আমি ২০১৯ সাল থেকে চাঁদপুর সদর ও হাইমচর এলাকায় মেঘনা নদীতে ড্রেজিং করছি। বিআইডব্লিউটিএ হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভে করে যে এরিয়া নির্ধারণ করে দিয়েছে, সে এরিয়াতেই আমার প্রতিষ্ঠান ড্রেজিং করছে। আমিও চাই নদীতে কোনো ধরনের অবৈধ ড্রেজিং না চলুক।

সেলিম খান জানান, ২০১৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ৮৪/(২) নং স্মারকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক নূরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত আবেদন ভূমি মন্ত্রণালয় এবং বিআইডব্লিউটিএকে দেয়া হয়। সে স্মারকে বিষয় ছিল- চাঁদপুর সদর ও হাইমচর উপজেলাধীন মেঘনা নদীর নাব্যতা রক্ষার্থে ড্রেজার দ্বারা বালু উত্তোলনের অনুমতি প্রসঙ্গে। এই আবেদনের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগে অফিসিয়াল কার্যক্রম চলতে থাকে। এরই প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর ১৩৪৯/১/৪ নং স্মারকে তৎকালীন জেলা প্রশাসক চাঁদপুর সদর ও হাইমচর উপজেলাধীন মেঘনা নদীর নাব্যতা রক্ষাকল্পে মেসার্স সেলিম এন্টারপ্রাইজকে ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্যে বিআইডব্লিউটিএকে অনুমতি প্রদানের জন্য অনুরোধপত্র দেন। জেলা প্রশাসকের আবেদনে সদর ও হাইমচরের মৌজাও উল্লেখ করা হয় বলে সেলিম খান জানান। যে মৌজায় ড্রেজিং কার্যক্রম চলবে।

মৌজাগুলো হলো- হাইমচর উপজেলাধীন চরহাইম, চরশোলাদী, পশ্চিম চরকৃষ্ণপুর, চরজহিরউদ্দিন, নীলকমল, মনিপুর, কুতুবপুর, বাজাপ্তি, গাজীপুর, চরভৈরবী, মিয়ারচর, চরপক্ষিদিয়া এবং সদর উপজেলাধীন রাজরাজেশ্বর, মিলারচর, ইব্রাহিমপুর, জাফরাবাদ, সফরমালী, চরমনোহরখাদী, চরজহিরউদ্দিন, চরপ্রকাশ, চরলগ্নিমারা, চরজাহাজমারা, মরারচর, চালিতাতলী, গুনানন্দী, গৌরাপিয়া, হিন্দুলী, সাখুয়া ও মির্জাপুর মৌজা। এসব মৌজা থেকে বিআইডব্লিউটিএ’র হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের মাধ্যমে মেঘনা নদীর তলদেশ থেকে ডুবোচর অপসারণের অনুরোধ জানান তৎকালীন জেলা প্রশাসক। এরপর দীর্ঘ সময় নিয়ে চিঠি চালাচালি এবং নানা জরিপের পর ২০১৯ সালে মার্চের ২০ তারিখে ৩৪১নং স্মারকে তৎকালীন জেলা প্রশাসক উপ-পরিচালক বিআইডব্লিউটিএ চাঁদপুরকে চিঠি দেন। সে চিঠিতে মেসার্স সেলিম এন্টারপ্রাইজকে উল্লেখিত মৌজা থেকে ৩০ কোটি ৮৪ লাখ ১০ হাজার ঘনফুট বালু উত্তোলনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে উপ-পরিচালক বিআইডব্লিউটিএ চাঁদপুরকে আদেশ দেন। এই চিঠির আলোকে একই বছরের ৩ এপ্রিল ৪০৬নং স্মারকে উপ-পরিচালক বিআইডব্লিউটিএ চাঁদপুর মেসার্স সেলিম এন্টারপ্রাইজকে মহামান্য হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা প্রদান করেন এবং একই তারিখে একই স্মারকের চিঠিতে বিআইডব্লিউটিএ মেসার্স সেলিম এন্টারপ্রাইজকে ড্রেজিংয়ের জন্য নির্ধারিত মৌজার দখল বুঝিয়ে দেন। এরপর তার প্রতিষ্ঠান ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু করে বলে সেলিম খান জানান।

সেলিম খান আরো জানান, ২০২১ সালের ৪ সেপ্টেম্বর বিআইডব্লিউটিএ'র উপ-পরিচালক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ) ৭৬৭নং স্মারকে হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ করে জেলা প্রশাসক চাঁদপুরকে প্রতিবেদন প্রেরণ করেন। এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ৩০ কোটি ৮৪ লক্ষ ১০ হাজার ঘনফুটের মধ্যে বর্তমানে ২৬ কোটি ৯১ লক্ষ প্রায় ঘনফুট বালু জমা আছে বিধায় মহামান্য হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী অবশিষ্ট মাটি/বালু উত্তোলন করতে পারবে। এছাড়া নদীর তলদেশের প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য প্রতিবছর অন্তরে আবার হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ করা প্রয়োজন।

সেলিম খান জানান, প্রতি বছর বিআইডব্লিউটিএর হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের ফি দেয়া হয় এবং সে অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ রিপোর্ট দেয়। সে রিপোর্ট এবং হাইকোর্টের আদেশের আলোকে আমার প্রতিষ্ঠানের ড্রেজিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে মাঝখানে করোনার কারণে দীর্ঘদিন ড্রেজিং কার্যক্রম বন্ধ ছিল।

২০১৯ সালের ২০ মার্চ ৩৪১ নং স্মারকে জেলা প্রশাসক চাদপুর মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের ৭৫৪৫/২০১৫ এর রিট পিটিশন মামলায় ২০১৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারির রায়ের আলোকে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যে উপ পরিচালক বিআইডব্লিউটিএ চাঁদপুরকে পত্র প্রেরণ করেন৷

উপ পরিচালক বিআইডব্লিউটিএ চাঁদপুর ২০১৯ সালের ৩ এপ্রিল ৪০৬ নং স্মারকে মেসার্স সেলিম এন্টারপ্রাইজকে ৩০ কোটি ৪৮.১০ লক্ষ ঘনফুট বালু মাটি উত্তোলনের আদেশ প্রদান করেন এবং বিআইডব্লিউটিএর হাইড্রগ্রাফিক চাটের চিহিৃত স্থান থেকে ড্রেজিং এর মাধ্যমে দেশীয় প্রযুক্তির ড্রেজার দ্বারা বালু/ মাটি উত্তোলন করা হয়৷ চাটের বাহিরে নয়।

৪ অক্টোবর ২০২১ তারিখ ৭৬৭ নং স্মারকে বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক প্রশাসন ও মানবসম্পদ মহোদয় জেলা প্রশাসক চাঁদপুর মহোদয়কে ৩০ কোটি ৪৮.১০ লক্ষ ঘনফুটের মধ্যে কি পরিমান বালু উত্তোলন করা হয়েছে কি পরিমাণ বালু মজুদ রয়েছে তার পত্র প্রেরণ করেন এবং মেসার্স সেলিম এন্টারপ্রাইজকে অনুলিপি প্রদান করেন।
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/70568
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2022 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ