Printed on Sat May 15 2021 9:10:26 PM

চাঁদের আদ্যোপান্ত

সাবরিনা লিজা
বিশ্বভিডিও সংবাদ
যে চাঁদ নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। আর চাঁদ নিয়ে যে কতো ধরনের গল্প আর উপমা আছে। তা তুলে ধরাও মুশকিল।

মহাবিশ্বে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী চাঁদ। এক এক প্রজন্মের কাছে এর পরিচয় এক এক রকম। ছোটবেলায় চাঁদকে সূতো কাটা বুড়ির ছোট্ট ঘর হিসেবে কল্পনা করে বাচ্চারা। কখনও আবার বিভিন্ন বয়সের রোমান্টিক লোকজন চাঁদকে সৌন্দর্যের উপমা হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন।

প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, আজ থেকে সাড়ে ৪ বিলিয়ন বছর আগে, সোলার সিস্টেম গঠিত হওয়ার কিছুদিন পরে অনেকটা মঙ্গল গ্রহের মত আকৃতির একটি শিলা-ভূত্বকের কঠিন অংশ পৃথিবীর সঙ্গে সজোরে সংঘর্ষ হওয়ার ফলেই সৃষ্টি হয় চাঁদের।

পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ চাঁদ। তবে ১৯৯৯ সালে বিজ্ঞানীরা একটি ৫ কিলোমিটার প্রশস্ত গ্রহাণু আবিষ্কার করেন যেটি পৃথিবীর মহাকর্ষীয় আকর্ষণে ধৃত হয়ে আরেকটি ‘চাঁদে’ রূপ নিতে পারে।

পৃথিবী থেকে আমরা সব সময়ই চাঁদের একই আকৃতি দেখে থাকি। পৃথিবী ও চাঁদ উভয়ই নিজ নিজ কক্ষপথে ঘুরলেও চাঁদ সর্বদা একই রকম। কারণ, অনেক আগেই পৃথিবীর মহাকর্ষীয় প্রভাব চাঁদের নিজস্ব কক্ষপথের ঘূর্ণনকে ধীরগতির করে দিয়েছে। তাই এর অরবিটাল পিরিয়ড ও রোটেশন পৃথিবীর সাথে মোটামুটি মিলে যাওয়ায় চাঁদের আকৃতি পরিবর্তিত হয়না।

পৃথিবীর বুকে থাকা ৪০০’র বেশি গাছ এসেছে চাঁদের মাটি থেকে। আসলে ব্যাপারটি হচ্ছে, ১৯৭১ সালে অ্যাপোলো ১৪ মিশনে নভোচারী স্টুয়ার্ট রোসা প্রায় ৫০০’র মত উদ্ভিদ-বীজ সাথে করে চাঁদে নিয়ে যান এবং লুনার সার্ফেসে রোপণ করেন। পরে সেগুলো পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনে অঙ্কুরিত করা হয়। গাছগুলো এখনও বেঁচে আছে। এগুলো ‘মুন ট্রি’ নামে পরিচিত।

চাঁদ দেখতে গোলাকার হলেও আসলে তা গোলাকার নয়। বরং, চাঁদের গঠন ডিম্বাকার। আরেকটি মজার বিষয় হচ্ছে, চাঁদের ভরকেন্দ্র গ্রহটির জ্যামিতিক কেন্দ্রে অবস্থিত নয়। এর অবস্থান চাঁদের কেন্দ্র থেকে ২ কিলোমিটার বাহিরে।

চাঁদকে আমরা অনেকে স্বপ্নের জগত হিসেবে জেনে থাকলেও এখানেও প্রাকৃতিক বিরূপ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। চাঁদে মাঝে মাঝে ভূমিকম্পও হয়। এগুলো ‘মুনকোয়াক’ নামে পরিচিত। লুনার নাইট সিজনে চন্দ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা মাইনাস ১৮০ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যায়। যা অত্যন্ত শীতল। কখনও আবার এর আবহাওয়া বেশ উত্তপ্তও হয়ে ওঠে। বলাই বাহুল্য, মানুষের বসবাসের জন্য চাঁদ মোটেই উপযোগী নয়।

প্রতিবছর পৃথিবী থেকে কিছুটা রোটেশনাল এনার্জি নিয়ে নেয় চাঁদ। এতে নিজস্ব কক্ষপথে বছরে ৩.৮ সেন্টিমিটার উপরে চলে যাচ্ছে চাঁদ। গবেষকরা জানিয়েছেন, সৃষ্টিলগ্নে পৃথিবী থেকে ২২ হাজার ৫৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিল চাঁদ। তবে এখন এটি ৪ লক্ষ্য ৫০ হজার কিলোমিটার দূরে চলে গেছে।

চাঁদ যাওয়ার সখ কার না জাগে। এবার সামর্থবানদের স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। এরইমধ্যে একজন-নারী ও একজন পুরুষকে চাঁদে পা রাখার সুযোগ করে দিচ্ছে নাসা।

চাঁদে যেতে কে না চায়। সেই আকাঙ্খা থেকেই সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ১৯৭২ সালে মানুষ প্রথমবারের মত চাঁদে পা রাখতে সক্ষম হয়। আর এবার চাঁদ নিয়ে নতুন প্রকল্প আর্টেমিস। ২০২৪ সালে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছে আমেরিকান মহাকাশ সংস্থা নাসা।

চাঁদে মানুষ নিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের পরিকল্পনার বিস্তারিত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। দু হাজার ৮০০ কোটি ডলারের এই মিশনে প্রথমবারের মত একজন নারী চাঁদের বুকে পা রাখবেন। এতে নাসা একজন পুরুষ ও একজন নারীকে চাঁদে পাঠাবে।

তবে নাসা বলছে তাদের পরিকল্পিত সময়সূচি ঠিক রাখতে হলে কংগ্রেসকে ৩২০ কোটি ডলারের তহবিল তাদের হাতে সময়মত তুলে দিতে হবে। কারণ নির্ধারিত সময়ে চাঁদের বুকে নামতে হলে তাদের সময়মত একটা অবতরণ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।

নভোচারীরা অ্যাপোলোর মতই একটি ক্যাপসুলে ভ্রমণ করবেন, যেটির নাম দেয়া হয়েছে ওরিয়ন। এসএলএস নামে একটি রকেট এটি উৎক্ষেপণ করবে।

নাসার একজন প্রশাসক জিম ব্রাইডেনস্টাইন বলেছেন, চাঁদের বুকে আর্টেমিস অবতরণের জন্য আগামী চার বছরে নাসার ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮ বিলিয়ন ডলার। এ প্রকল্পের বাজেটে নির্ধানিত খরচ গুলো হলো, এসএলএস উৎক্ষেপণের খরচ, ওরিয়ন বাবদ সব ব্যয়, এছাড়াও চাঁদে মানুষের নামার খরচ এবং নভোচারীদের মহাকাশ স্যুটের জন্য যাবতীয় খরচখরচা।

তিনি আরও জানান, আমেরিকান কংগ্রেস এবং সেনেটের কাছে অবতরণ ব্যবস্থা তৈরি করার জন্য তাদের আবেদন করা ৩২০ কোটি ডলার ২০২১ সালে তাদের হাতে আসতে হবে। এই অর্থ সময়মত পেলে তবেই তাদের লক্ষ্য অর্থাৎ ২০২৪ সালের মধ্যে চাঁদে দ্বিতীয়বারের মত অবতরণের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে।

২০২৪ সালে চাঁদের বুকে প্রথম যে নারী পা রাখছেন, তার কিন্তু মহাকাশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আছে।

আমেরিকার হাউস অফ রেপ্রেজেনটিটিভ চাঁদে অবতরণের যান তৈরির জন্য ৬০ কোটি ডলার অনুমোদন করে ইতোমধ্যেই একটি বিল পাশ করেছে। তবে নভোযানটি পুরোপুরি তৈরি করতে নাসার আরও বেশি অর্থের প্রয়োজন হবে।

মি. ব্রাইডেনস্টাইন ২০১৯ সালের জুলাই মাসে সিএনএন টিভিতে বলেছেন, ২০২৪ সালে চাঁদের বুকে প্রথম পদচারণা করবেন যে নারী তিনি হবেন ''এমন একজন যার মহাকাশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আছে - যিনি ইতোমধ্যেই কোন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে গেছেন''। নভোচারী গোষ্ঠীর মধ্যে থেকেই কাউকে এই মিশনের জন্য বেছে নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

ওই সাক্ষাৎকারের সময় ১২ জন নারী নভোচারীর নাম সামনে এসেছিল। এরপর আরও পাঁচজন নারী নভোচারী নাসার তালিকাভুক্ত হয়েছেন। এবছরের শেষের দিকে প্রশিক্ষণ শেষ করে তারা নাসায় যোগ দিয়েছেন। তবে যোগ্যতার জন্য যেসব মাপকাঠি নির্ধারণ করা হয়েছে, আগামী চার বছরের মধ্যে সেগুলো অর্জন করে মিশনের জন্য তারা তৈরি হতে পারবেন কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়।

আর্টেমিসের জন্য নভোচারী নির্বাচনের সময়সূচি জানতে চাওয়া হলে নাসার প্রধান বলেছেন, প্রথম মিশনটি পাঠানোর অন্তত দুবছর আগে তারা নভোচারীদের দলটি নির্বাচন করতে চান।

তবে তিনি বলেন, আর্টেমিসে নভোচারী হিসেবে কারা যাবেন সেটা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শিগগিরিই শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ। এটা অনুপ্রেরণা হিসেবেও কাজ করবে বলেএ মনে করছেন তিনি।
হোয়াইট হাউসও চাঁদে আবার নভোচারী পাঠাতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। কারণ আমেরিকা মহাকাশ চারণায় তাদের নেতৃত্ব পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে।

চাঁদেই যদি জ্বালানি তৈরি সম্ভব হয়, অনেকাংশেই খরচ কমে আসবে। তবে চাঁদ নিয়ে চাঁদে দখল প্রতিষ্ঠা নিয়ে কেউই পিছিয়ে নেই।

নাসা চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে জমে থাকা বরফ-পানির নমুনা সংগ্রহ কারার পরিকল্পনা করছে। এর সাহয্যে চাঁদেই স্বল্প খরচে রকেটের জন্য জ্বালানি তৈরি করা সম্ভব হতে পারে বলে ধারনা করা হচ্ছে। এতে পৃথিবী থেকে রকেটের জন্য জ্বালানি বহন করে নিয়ে যেতে হবে না এবং এটা চান্দ্র অর্থনীতির একটা ভিত তৈরি করবে।

তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স চীনের মহাকাশ উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন। ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে পূর্ব এশিয়ান পরাশক্তি চীন প্রথম চাঁদের বেশ ভেতরের দিকে একটি রোবট চালিত রোভার যান স্বাচ্ছন্দে অবতরণ করিয়েছিল। পৃথিবীর গবেষণাগারে চাঁদের মাটির নমুনা পৌঁছে দেবার জন্য প্রথম মিশন পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন। চীন তাদের নভোচারীদের জন্য নতুন প্রজন্মের মহাকাশযান তৈরি করছে,যা চাঁদে পাঠানোর উপযোগী। যদিও ২০২৪-এর মধ্যে তারা এই মহাকাশযান বানাতে পারবে কিনা তার নিশ্চয়তা তারা দেয়নি। তবে এই দশকেই সে লক্ষ্যে চীন অনেকটাই এগিয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

নাসার নতুন নথিতে আমেরিকান পরিকল্পনার প্রথম পর্যায়ের রূপরেখা দেয়া হয়েছে। এতে চাঁদে নভোচারীবিহীন পরীক্ষামূলক যান পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। এর প্রথম পর্যায় হলো আর্টেমিস ওয়ান। এটি পাঠানো হবে ২০২১ সালের শরতকালে।

এরপর আর্টেমিস-টুর জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো চিহ্ণিত করে সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করা হবে। আর্টেমিস-টু নভোচারীদের নিয়ে একইধরনের মিশন চালাবে চাঁদকে পরিক্রমা করে। উৎক্ষেপক রকেট থেকে বিচ্ছিন্ন হবার পর ওরিয়ন মহাকাশযানটি পরিচালনা করবেন নভোচারীরা নিজে। এরপর আর্টেমিস-থ্রি যাবে নভোচারীদের নিয়ে চাঁদে অবতরণের লক্ষ্যে।

আরও পড়ুন : এবার চাঁদে যাবে নারী মহাকাশচারী

অ্যাপোলো ১৭ চাঁদে অবতরণ করার ৪৮ বছর আগে এটাই হবে আমেরিকার চন্দ্র মিশন যেখানে নভোচারীরা আবার চাঁদের বুকে পা রাখবেন। ইতোমধ্যে নাসা বেশ কিছু সংস্থাকে অবতরণ যানের নকশা তৈরির কাজ দিয়েছে।

নাসা তার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসাবে এই দশকের শেষ দিকে নভোচারীদের জন্য আর্টেমিস বেস ক্যাম্প নামে একটি ক্যাম্প তৈরি করবে যেখানে চাঁদে দীর্ঘমেয়াদী অভিযান চালানোর জন্য অবকাঠামো থাকবে।

ভয়েসটিভি/এএস
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/23895
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2021 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ