Printed on Tue Sep 21 2021 6:08:14 PM

চাষ হবে 'কাকিলা'

কামরুজ্জামান মিন্টু, ময়মনসিংহ
অর্থনীতি
চাষ হবে 'কাকিলা'
চাষ হবে 'কাকিলা'
'কাকিলা' মাছটি একসময় প্রচুর পরিমাণে পাওয়া গেলেও বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। ফলে মাছটির প্রাচুর্য ফিরিয়ে আনতে গবেষণা শুরু হয় ৷ দীর্ঘ তিন বছর গবেষণার পর এবার কৃত্রিম প্রজননে এর পোনা উৎপাদনে সফল হয়েছেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) বিজ্ঞানীরা। এতে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাওয়াসহ আবার পানিতে ঢেউ তুলবে কাকিলা।

গবেষণা দলে ছিলেন, বিএফআরআইয়ের স্বাদুপানি উপকেন্দ্র যশোরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কমকর্তা ড. মো. রবিউল আউয়াল হোসেন, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কমকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম এবং বৈজ্ঞানিক কমকর্তা শিশির কুমার দে।

সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা জানান, গবেষণায় রাজবাড়ি জেলা সংলগ্ন কুষ্টিয়ার পদ্মা নদী থেকে কাকিলা ব্রুড (মা-বাবা মাছ) মাছ সংগ্রহ করা হয়। বিশেষ পদ্ধতিতে অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করে যশোরের স্বাদু পানি উপকেন্দ্রের পুকুরে ছাড়া হয়েছে। পরে হ্যাচারিতে উৎপাদিত কার্প জাতীয় মাছের জীবিত পোনা ও নানা জলাশয় থেকে সংগৃহীত জীবিত ছোট মাছ খাইয়ে পুকুরের আবদ্ধ পরিবেশে মাছকে অভ্যস্ত করা হয়।

এরপর চলতি বছরের মে থেকে বৈজ্ঞানিক প্রটোকল অনুসরণ করে কৃত্রিম প্রজননের উদ্দেশ্যে উপকেন্দ্রের হ্যাচারিতে নির্দিষ্ট সংখ্যক মা-বাবা মাছকে বিভিন্ন ডোজে হরমোন ইনজেকশন প্রয়োগ করা হয়েছে। এভাবে কয়েকবার বিভিন্ন ডোজের ট্রায়াল দেওয়া হলেও মাছের প্রজননে সফলতা আসেনি। অবশেষে ২৫ আগস্ট প্রজননকৃত মাছের ডিম থেকে পোনা বের হয় এবং কাকিলা মাছের কৃত্রিম প্রজননে সফলতা আসে।

গবেষক দলের সদস্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শিশির কুমার দে বলেন, কাকিলা মাছের প্রজননের ট্রায়ালের সময় চৌবাচ্চার পানির গড় তাপমাত্রা ছিল ২৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ ছিল চার দশমিক পাঁচ মিলিগ্রাম/লিটার, পিএইচ ছিল সাত দশমিক ছয়।

প্রতি ১০০ গ্রাম খাবার উপযোগী কাকিলা মাছে ১৭ দশমিক এক শতাংশ প্রোটিন, লিপিড দুই দশমিক ২৩ শতাংশ, ফসফরাস দুই দশমিক ১৪ শতাংশ ও শূন্য দশমিক ৯৪ শতাংশ ক্যালসিয়াম রয়েছে, যা অন্যান্য ছোট মাছের তুলনায় অনেক বেশি।

ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, কাকিলা বা 'কাখলে' একটি বিলুপ্তপ্রায় মাছ। এর দেহ সরু, ঠোঁট লম্বাটে ও ধারালো দাঁতযুক্ত। বাংলাদেশে যে জাতটি পাওয়া যায়, সেটি মিঠা পানির জাত। মাছটি বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চলে কাইকল্যা বা কাইক্কা নামেই বেশি পরিচিত।

মাছটির বৈজ্ঞানিক নাম Xenentodon cancila । ইংরেজিতে বলা হয় 'ফ্রেশওয়াটার গারফিশ'। এটি Belonidae পরিবারের অন্তর্গত। বাংলাদেশ ছাড়াও শ্রীলঙ্কা, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে এ মাছ পাওয়া যায়। তবে, রং ও আকারে কিছু পার্থক্য থাকে।

মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, 'কাকিলা মাছের কৃত্রিম প্রজনন এটিই বাংলাদেশ প্রথম এবং বিশ্বের কোথাও এ মাছের কৃত্রিম প্রজননের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।'

গবেষক দলের প্রধান ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. রবিউল আউয়াল হোসেন বলেন, কাকিলা মূলত ছোট মাছ খেয়ে থাকে। প্রাকৃতিকভাবে প্রবাহমান জলাশয়ে বিশেষ করে নদীতে এবং বর্ষাকালে প্লাবিত অঞ্চলে প্রজনন করে থাকে। পরিণত মাছেরা ভাসমান জলজ উদ্ভিদ নেই- এমন স্থানে বসবাস করলেও জলজ উদ্ভিদের পাতার নিচে ও ভাসমান শেকড়ে এদের স্ত্রীরা ডিম পাড়ে।

প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আরও বলেন, কাকিলা মাছের প্রজননের জন্য পিজি (পিটুইটারি গ্ল্যান্ড) হরমোন ব্যবহার করা হয়। গত ১৮ আগস্ট পুকুর থেকে মাছ ধরে চার জোড়া মা-বাবা নির্বাচন করে হ্যাচারির চৌবাচ্চায় নির্দিষ্ট সময় ঝর্ণাধারা দিয়ে মা-বাবা মাছকে একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় হরমোন ইনজেকশন দেওয়া হয়।

পরে মা-বাবা মাছকে একত্রে একটি চৌবাচ্চায় রেখে ঝর্ণাধারা দিয়ে সেখানে কচুরি পানা রাখা হয়। প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পরে মা মাছ ডিম ছাড়ে। ডিমের ভেতরে বাচ্চার বিভিন্ন দশা ও উন্নয়ন অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। ডিম ছাড়ার প্রায় ৯০ থেকে ১০০ ঘণ্টার মধ্যে নিষিক্ত ডিম থেকে বাচ্চা বের হয়।

বিএফআরআইয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শাহা আলী বলেন, মানবদেহের জন্য উপকারী অনুপুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ এবং কাঁটা কম থাকায় মাছটি অনেকের কাছে খুব প্রিয়। একসময় অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে হরহামেশা দেখা মিলত কাকিলার। কিন্তু জলবায়ুর প্রভাব, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং মানবসৃষ্ট নানা কারণে বাসস্থান ও প্রজননক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এ মাছের প্রাচুর্য কমে গেছে। তিন বছরের নিবিড় গবেষণার পর এই সফলতা পাওয়া যায়। এর ফলে কাকিলা মাছ আর হারাবে না। ফিরবে খাবার টেবিলে।

মাছটিকে চাষাবাদের আওতায় আনা সম্পর্কে তিনি বলেন, গবেষণার মাধ্যমে কৃত্রিম প্রজননে সফলতা পাওয়া গেলেও আরও পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। তবে আশা করছি, এক বছরের মধ্যেই চাষাবাদের আওতায় আনা যাবে বিলুপ্তপ্রায় এই মাছটি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন, দেশের বিলুপ্তপ্রায় ৬৪টি মাছের মধ্যে ৩০টির কৃত্রিম প্রজননে এরই মধ্যে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট সফলতা দেখিয়েছে। সফলতার ধারাবাহিকতায় ৩১তম মাছ হিসেবে কাকিলা মাছ যুক্ত হলো।

তিনি আরো বলেন, পর্যায়ক্রমে সব বিপন্ন প্রজাতির মাছকে কৃত্রিম প্রজননের আওতায় আনা হবে। যাতে দেশের প্রত্যেক মানুষের খাবারের পাতে থাকে দেশীয় মাছ।

দেশীয় মাছকে সংরক্ষণের জন্যে ময়মনসিংহে ইনস্টিটিউটের সদর দপ্তরে লাইভ জিন ব্যাংক স্থাপন করা হয়েছে। দেশীয় মাছ সংরক্ষণ গবেষণায় বিশেষ অবদানের জন্যে ২০২০ সালে
একুশে পদক অর্জন করেছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট।

আরও পড়ুন : পঞ্চগড়ে ক্যামিলিয়া খোলা আকাশ স্কুল

ভয়েস টিভি/এএন
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/52442
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2021 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ