Printed on Sat Jun 19 2021 4:05:55 AM

চুলের টুপিতে সফল উদ্যোক্তা উচ্চশিক্ষিত লাইজু, রপ্তানি হচ্ছে চীনে

মমিনুল ইসলাম বাবু, কুড়িগ্রাম
সারাদেশ
চুলের
চুলের
কুড়িগ্রামে চুল দিয়ে তৈরি করা মাথার টুপি রপ্তানি হচ্ছে চীনে। এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক নারী উদ্যোক্তা। নিজে স্বাবলম্বী হবার পাশাপাশি সৃষ্টি করেছেন আরও ৩০ নারীর কর্মসংস্থান।

এমন ব্যতিক্রমী কর্মের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন সীমান্ত ঘেঁষা ফুলবাড়ী উপজেলার সদর ইউনিয়নের চন্দ্রখানা বালাতাড়ি গ্রামের কৃষক হেছার আলী মেয়ে লাইজু খাতুন। বাণিজ্যিকভাবে মাথার চুল দিয়ে টুপি তৈরি করে এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা ও সফল উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন এই নারী।

কৃষক হেছার আলী অর্থাভাবে বড় তিন মেয়েকে লেখাপড়া করাতে না পেরে বিয়ে দিয়ে দেন। তবে শত বাঁধার মুখেও নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় চতুর্থ মেয়ে লাইজু খাতুন রংপুর সরকারি কলেজ থেকে বাংলায় মার্স্টাস সম্পন্ন করেন। আর সব ছোট মেয়েকে এসএসসি পাশ করেছে।

লাইজু খাতুন গ্রামের গরিব-অসহায় পরিবারের ৩০ জন নারীকে দিয়ে চুলের টুপি তৈরি করে রপ্তানী করছেন। টুপি তৈরি করে প্রতি মাসে ৫/৮ হাজার টাকা আয় করে পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়েছেন অনেক নারী। সরকারি-বেসরকারিভাবে সুযোগ-সুবিধা পেলে প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে অবহেলিত এলাকার শতশত নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখছেন এই নারী উদ্যোক্তা।

লাইজুউদ্যোক্তা লাইজু খাতুন বলেন, আমার অনেক দিনের ইচ্ছা ও স্বপ্ন ছিল একজন সফল উদ্যোক্তা হব। পাশাপাশি গ্রামের অবহেলিত ও বঞ্চিত নারীদের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করব। এই স্বপ্নটা পুরণ করতে আমার স্বামীর সহযোগিতায় ময়মসিংহে ৫ দিন এবং ঢাকা উত্তরায় ১০ দিন চুল দিয়ে টুপি তৈরির প্রশিক্ষণ নেই। প্রশিক্ষণ নিয়ে গ্রামের ৩০জন নারীকে আমার নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় একমাসের প্রশিক্ষণ দেই। আমার বাবার বাড়িতে একটি টিনসেড ঘরে স্বল্প পরিসরে “সিনহা বিনতে সামিউল হেয়ার ক্যাপ নিটিং লি.” প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু করি চলতি বছরে।

প্রায় দেড় লাখ টাকা ব্যয়ে প্রতিষ্ঠানটি চালু করি। গড়ে মাসে ৯০-১০০টি চুলের টুপি তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিটি টুপিতে গড়ে সাড়ে তিনশ টাকা খরচ করে ঢাকায় বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৫ শ টাকায়। আমাদের তৈরিকৃত চুলের টুপি ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চীনে রপ্তানি করছে।

নারী শ্রমিক নাসিমা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামীর দিন মজুরির টাকায় সংসার চলে। কাজ জুটলে সেদিন পেটে খাবার যায় না হলে এক/আধ বেলা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে। লাইজু আপার এডে কাজের সুযোগ পাইছি। গত তিন মাস থাকি মাসে ৪/৭ হাজার টাকা আয় করছি। এতে করে হামার সংসারে অভাব কমি গেছে।’

নারী শ্রমিক খাদিজা বেগম বলেন, ‘মোর স্বামী দিন মজুরি করিয়া সংসার চালায়। এই করোনা-ফরোনার মধ্যে তেমন কাম কাজ জোডে না। ঠিক মতো সংসারও চলে না। মুই লাইজু আপার এডে কাম করং চুল দিয়া টুপি বানার তাতে খাটুনি কম হয়। মজুরিও ভালো পাওয়া যায়। এতে সংসার ভালোই চলছে। আমরা আশা করি লাইজু আপার এই প্রতিষ্ঠান আরও বড় হোক। হামার এলাকার মহিলা গুলাও কাম করি খাবার পাক।’

৯ম শ্রেণীর ছাত্রী নিশি আকতার বলেন, করোনার মধ্যে স্কুল বন্ধ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। লাইজু আপার চুলের টুপি তৈরির বিষয়টি জানতে পারি। পরে প্রশিক্ষণের সময় দেখলাম কম পরিশ্রমে আয় করা সম্ভব। তাই এই চুলের টুপি তৈরির কাজ করে মাসে ৫/৭হাজার টাকা আয় করছি। এতে করে আমি নিজের ও সংসারে সহযোগিতা করতে পারছি।অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আনিছা আক্তার বলেন, স্কুল বন্ধ থাকায় ১০জন শিক্ষার্থী লাইজু আপার প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ করছি। তারাও পড়ালেখার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়ানো স্বপ্ন দেখছেন।

উদ্যোক্তা লাইজু খাতুনের স্বামী সামিউল ইসলাম সেলিম বলেন, লাইজু খুবই মেধাবী একজন নারী। সে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার পরেও চাকরি করার ইচ্ছে ছিল না। ওল্টো স্বপ্ন দেখত সফল নারী উদ্যোক্তা হয়ে নিজে সাবলম্বী হয়ে গ্রামের অবহেলিত নারীদের সাবলম্বী করে তুলবেন। তাই স্বামী হিসাবে স্ত্রীর স্বপ্ন পুরণের জন্য তাকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছি। বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ এবং নিজেদের জমানো অর্থ দিয়ে ৩০ জন নারীকে প্রশিক্ষণ দেয়া ও বিভিন্ন কাঁচামালসহ এ যাবত দেড় লাখ টাকা খরচ করেছে। আমার স্ত্রী যেভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে আশা করছি প্রতিষ্ঠানটি টেঁকানো সম্ভব। স্ত্রী লাইজুসহ প্রতিষ্ঠানের ৩০ নারীর জন্য সাফল্য কামনা করছি।

উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সোহেলী পারভীন বলেন, এটা খুবেই ভাল উদ্যোগ। নারীরা সমাজে সু-প্রতিষ্ঠিত হোক সকলের চায়। লাইজুর প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে লাইজুর প্রতিষ্ঠানটি সমিতির অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করা হলে উপজেলার শতাধিক নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আমার বিশ্বাস।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমান দাস বলেন, উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। এটা খুবেই ইতিবাচক। নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হলে দেশ ও জাতি এগিয়ে যাবে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নতুন নতুন উদ্যোক্তাদের সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

আরও পড়ুন: সাভারে রপ্তানির অপেক্ষায় হাজার কোটি টাকার চামড়া

আরও পড়ুন: করোনা আক্রান্ত স্ত্রীকে দিয়ে ভয় দেখিয়ে পাওনা টাকা আদায়

ভয়েস টিভি/এসএফ
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/44874
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2021 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ