Printed on Sat Sep 18 2021 1:10:33 AM

তালেবান উত্থানে বাংলাদেশের দুশ্চিন্তা!

রনজক রিজভী
মুক্তমতজাতীয়
তালেবান উত্থানে
তালেবান উত্থানে
কী ঘটতে যাচ্ছে আফগানিস্তানে। প্রায় বাধাহীনভাবে একের পর এক প্রদেশ দখলের পর আফগান সরকারের পতন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে তালেবান। যদিও সবকিছুই হয়েছে শান্তিপূর্ণভাবে। পরিস্থিতি বদলাতে দেশটির সেনাপ্রধানকেও সরিয়েছিল দেশটি। কিন্তু প্রতিরোধ বা রুখে দাঁড়ানোর কোনো ঘটনাই চোখে পড়েনি। একসময় তালেবান নিয়ে যেসব পক্ষের অনেক মাথা ব্যথা ছিল। আফগান প্রশ্নে তারাও নীরব থেকেছে।

যুক্তরাষ্ট্রসহ আগের সব ইতিহাসই বলে দেয় জনসমর্থন না পাওয়ায় কেউই দেশটিতে টিকতে পারেনি। সবাইকে খুব বাজে ভাবে বিদায় নিতে হয়েছে। এখন বড় প্রশ্নটি হচ্ছে- তালেবানকেই কী জনগণ সমর্থন দিচ্ছে? বিশ্বের মোড়ল রাষ্ট্রগুলোর চুপ থাকার এটাই কারণ কী না তাও পরিস্কার নয়। আর তালেবান উত্থানে আঞ্চলিক রাজনীতির কী হবে। স্বস্তি-অস্বস্তির পাল্লাই বা কারা বহন করবে, এ নিয়ে নিশ্চয় হিসেব করার সময় এসেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার এই রাষ্ট্রটির অবস্থান ইরান, পাকিস্তান, চীন, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের মধ্যস্থলে। আফগানিস্তানের পূর্বে ও দক্ষিণে পাকিস্তান, পশ্চিমে ইরান, উত্তরে তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান এবং উত্তর-পূর্বে গণচীন। প্রাচীনকাল থেকেই এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত আফগান। তাদের সংঘাতের ইতিহাসও দীর্ঘ। অবশ্য এই সংঘাতে সবাই যে খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থায় থেকেছে, সেটা বলার কারণ একেবারেই নেই। যা বিগত ২০ বছর এবং বর্তমান পরিস্থিতিই তার জলন্ত উদাহরণ। সে যাই হোক, সার্বিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, তা নজরে রাখা প্রয়োজন।

১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তান শাসন করেছে তালেবান। অর্থাৎ নব্বয়ের দশকেই ধর্মভিত্তিক এই উগ্রসংগঠনটির তৎপরতা শুরু এবং সরকার গঠন করতেও সক্ষম হয়। এরপরের ঘটনাগুলো সবারই জানা। যে ধরনের শাসনের কবলে পড়েছিল দেশটি। যা সভ্যতার সঙ্গে একেবারেই বেমানান। তাদের সেই বর্বরতাও দেখতে হয়েছে। সেইসঙ্গে আল কায়েদাকে সমর্থন এবং ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দেয়ার ফলও তাদের ভোগ করতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলা পরবর্তী আগ্রাসনের শিকারও হতে হয়েছে। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোটের যৌথ অভিযানের মাধ্যমে তালিবান শাসনের অবসান ঘটানো হয়।

আফগানিস্তানে তালেবান উত্থানের হাওয়া সেসময় অনেক দেশেই লেগেছে। বাদ যায়নি বাংলাদেশও। ৯০-র দশকের প্রথম দিকে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের উপর সশস্ত্র আক্রমণ, যশোরে উদীচীর সম্মেলনে হামলা, গোপালগঞ্জের বানিয়ারচর জলিরপাড়ে হামলা, পুরানা পল্টনে সিপিবি’র সমাবেশে হামলা, নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে হামলা, সিলেটে হযরত শাহজালাল (রা.) এর মাজার শরীফ-এ বার্ষিক ওরশ চলাকালে হামলা, বাগেরহাটে শেখ হেলালের জনসভায় মুফতি হান্নানের পরিকল্পনা ও নির্দেশে জঙ্গিরা বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। তখনই নজরে আসে, জঙ্গিরা দেশের অভ্যন্তরে কড়া নাড়ছে।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা দেশে একসঙ্গে সিরিজ বোমা হামলা চালায় ওহাবী মাও. আব্দুর রহমান ও বাংলা ভাইয়ের সন্ত্রাসী দল জেএমবি। ওই হামলার মাধ্যমে জেএমবি তাদের শক্তির মহড়া দেয়। এর আগে হরকাতুল জিহাদের সদস্যরা ১৯৯৯ সালের ১৮ জানুয়ারি ঢাকায় কবি শামসুর রাহমানের বাড়িতে তার উপর হামলা, ২০০৩ সালের ২৩ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার সভাস্থলে বোমা স্থাপন করে, ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনার বটমূলে বোমা হামলা, ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট পল্টনে গ্রেনেড হামলা, ২০০৪ সালে সিলেটে হযরত শাহজালাল (রা.) এর মাজার শরীফ জিয়ারতের সময় সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর উপর বোমা হামলা, ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জের বৈদ্যেরবাজারে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার জনসভায় গ্রেনেড হামলা চালিয়ে হত্যা, ২০০১ সালে লেখক হুমায়ুন আজাদকে ছুরিকাহত করা ছাড়াও অনেক ঘটনা ঘটেছে। যার সবই জেএমবি ও হরকাতুল জিহাদের নেতৃত্বে হয়েছে। বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা এবং উত্থানের ইতিহাসের সঙ্গে আফগানিস্তানের যোগসূত্র আছে। যার প্রকাশ্য রূপ পায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়। তখনই বাংলার মাটিতে উচ্চারিত হয়েছে- ‘আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান’। বাংলাদেশে যাদের হাত ধরে জঙ্গিবাদের উত্থান। তাদের বড় অংশই আফগানিস্তানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং তাদের হয়ে যুদ্ধ করেছে। তাদের বলা হতো আফগানফেরত বাংলাদেশি মুজাহিদ।

১৯৮৬ সালে পাকিস্তান হয়ে যারা আফগানিস্তানে তালেবানের পক্ষ হয়ে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, তাদেরই একটি অংশ পাকিস্তান-আফগানিস্তানের বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রথম জঙ্গি সংগঠন গড়ে তোলে। আফগানফেরত এসব যোদ্ধার বড় একটি অংশ বাংলাদেশে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন গড়ে তোলাসহ জঙ্গি তৎপরতা উত্থানে কাজ করেছে। এদের মধ্যে অন্যতম আফগানফেরত যোদ্ধা জঙ্গি মুফতি হান্নান, মুফতি আবদুর রউফ ও আবদুস সালাম। এদের এই তালিকা অবশ্য বেশ লম্বা।

৮০ দশকের দিকে আফগানিস্তানের রণাঙ্গনে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) জন্ম হয়। ১৯৮৯ সালের শেষ দিকে মুফতি আবদুল হান্নানের নেতৃত্বে প্রায় অর্ধশত যোদ্ধা বাংলাদেশে ফিরে আসেন। পরে এসব যোদ্ধা দেশের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশিদের আফগান যুদ্ধে যাওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করতে থাকে। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই তালেবান, তেহরি-ই-ইসলামী, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন, বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি, লস্কর-ই তৈয়বার অর্থ সহযোগিতায় এসব যোদ্ধা ১৯৯৪ সালের মাঝামাঝি সময় কয়েকশ বাংলাদেশিকে আফগানযুদ্ধে পাঠাতে সক্ষম হয়। আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সেখান থেকে বাংলাদেশি কথিত মুজাহিদরা ফিরে এসে ১৯৯৩ সালে এদেশে হুজির কার্যক্রম শুরু করে।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পাঁচ বছরে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রায় সাত হাজার এনজিওকে রেজিস্ট্রেশন দেয়া হয়। এনজিওগুলোর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা আসে বাংলাদেশে। এসব টাকা জঙ্গি তৎপরতার কাজে ব্যয় করা হয় বলে গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। যদিও বর্তমানে বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। তবে আফগানিস্তানে তালেবান উত্থানে নতুন করে জঙ্গিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। এই শঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দেয়ার উপায় নেই। একারণে বাংলাদেশে এক ধরনের অস্বস্তি ভর করে আছে।

বড় ভয়ের কারণ হলো- তালেবান প্রায় বাধাহীনভাবে আফগানিস্তানের ৩৪ প্রদেশের ২৮টির বেশি প্রাদেশিক রাজধানী দখলের পর কাবুল ঘিরে ফেলে প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগে বাধ্য করেছে। এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করাতে বাধ্য করেছে। এরআগে বিনাযুদ্ধেও কোনো কোনো প্রদেশের দখল করে তারা। এতে দেশটির সরকারি বাহিনীর ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়ে। তালেবানকে পরাজিত করতে আফগান সরকার যে তিন ধাপের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার কথা বলেছিল- এর প্রথমটি ছিল- পরাজয় বন্ধ করা। দ্বিতীয় ধাপে সরকারি বাহিনীকে জড়ো করে শহরগুলোর বাইরে নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা। এবং তৃতীয়ত. আক্রমণাত্মক কার্যক্রম শুরু করা। এর কোনোটিই শেষ পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়নি। অবশ্য আফগান সরকারকে তালেবানের সঙ্গে সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।

অন্তর্ভুক্তিমূলক সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য আফগান সরকারের উচিত তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য নিষ্পত্তি, সব স্টেকহোল্ডারদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি ও একতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইইউ আফগান সরকারকে তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগে উৎসাহিত করেছে। তাদের বক্তব্য ছিল- তালেবান যদি জোর করে ক্ষমতা নেয় এবং একটি ইসলামী আমিরাত পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, তবে তারা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাবে না। বিচ্ছিন্নতা ও আন্তর্জাতিক অসহযোগিতার মুখে পড়বে এবং আফগানিস্তানে সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার মুখোমুখি হবে।

তালেবান উত্থানে অনেক হিসাব নিকাশ চলছে আঞ্চলিক রাজনীতিতেও। আফগান থেকে যুক্তরাষ্ট্র চলে যাওয়ার কারণে স্বস্তিতে আছে চীন। তাদের কাছে গুরুত্ব ব্যবসা। সেদিকেই নজর চীনের। আর তালেবানদের কারণে অস্বস্তিতে আছে রাশিয়া ও ভারত। যদিও এই দুই দেশের অস্বস্তির কারণ ভিন্ন। রাশিয়া এরইমধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বৈঠক আহ্বান করে বসেছে। অন্যদিকে, কেবল পাকিস্তানই বেশি স্বস্তিতে। কারণ আফগান সরকারের পাশাপাশি তালেবানদের সঙ্গেও তারা সম্পর্ক রেখে আসছিল।

আধিপত্য এবং ব্যবসা নিয়ে বিভিন্ন দেশের ভাবনা থাকলেও বাংলাদেশের বিষয়টি পুরোপুরি বিপরীত। দেশে জঙ্গিবাদ আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেড়ে যাবে। পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলতে পারে উন্নয়ন এবং সম্ভবনার দুয়ারেও। তাই ভাবনার সময় এখনই।

রনজক রিজভী : গণমাধ্যমকর্মী
rizvynca@gmail.com
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/51182
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2021 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ