Printed on Wed Oct 20 2021 7:28:25 AM

থ্রি ইডিয়টস এর ফুংসুখ ওয়াংড়ু বাস্তবের সোনম ওয়াংচুক!

বিনোদন ডেস্ক
বিনোদনভিডিও সংবাদ
থ্রি ইডিয়টস
থ্রি ইডিয়টস
২০০৯ সালে মুক্তি পায় গুণী পরিচালক রাজকুমার হিরানীর 'থ্রি ইডিয়টস' সিনেমাটি। এতে অভিনয় করে বিশ্বব্যাপী প্রশংসা কুড়ান বলিউড অভিনেতা আমির খান। পর্দায় দেখানো ফুংসুখ ওয়াংড়ু বাস্তবের সোনম ওয়াংচুক। সোনম ওয়াংচুক শিক্ষা আর বিজ্ঞান দিয়ে নীরব বিপ্লব করে চলেছেন লাদাখে। সোনম ওয়াংচুক জিতেছেন এশিয়ার নোবেল খ্যাত র্যা মন ম্যাগসেসাই পুরস্কার। অনেকের মতে, এই ব্যক্তির জীবনী থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই রাজকুমার হিরানি তৈরি করেছেন 'থ্রি ইডিয়টস'।

১৯৬৬ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর লাদাখের লেহ জেলার উলেটোকপো গ্রামে থ্রি ইডিয়টস সিনেমার শেষ দৃশ্যে দেখানো সেই গাঢ় নীল হ্রদটির কাছেই জন্মেছিলেন সোনম। বড় হয়ে পড়াশোনার জন্য পাড়ি জমান প্রাদেশিক রাজধানী শ্রীনগরে।

দশম শ্রেণির মেট্রিক পরীক্ষায় প্রায় অধিকাংশ শিক্ষার্থীই ফেল করছে। যার ফলে শিক্ষা জীবন থেকে ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় পাসের হার তো দূরের কথা, অংশগ্রহণের হারই প্রায় শূন্যর কোঠায়। নিজ প্রদেশে শিক্ষার এমন অধোগতি দেখে হতাশ সোনম। যন্ত্রকৌশলে সদ্য গ্র্যাজুয়েশন করা সোনম বন্ধুদের নিয়ে পড়ে তুললেন Students Educational and Cultural Movement of Ladakh (SECMOL)। শিক্ষা প্রচারণার সাথে সাথে খুলে ফেললেন সেকমল অল্টারনেটিভ স্কুল নামে চমৎকার এক বিদ্যালয়।

এই উদ্যোগে পাশে পেলেন সরকার ও স্থানীয় জনগণকে। যৌথ এই প্রজেক্টের নাম দেয়া হলো ‘অপারেশন নিউ হোপ'। গড়ে উঠল দারুণ এক সামাজিক আন্দোলন। শিক্ষার জন্য বাবা-মাকে সচেতন করা, বিজ্ঞান ও বইকে ভালোবাসতে শেখানো, পড়াশোনায় উৎসাহী করা নিয়ে ক্যাম্পেইন করে ‘নিউ হোপ'। অল্প দিনেই ফল পেতে শুরু করে নিউ হোপ- লাদাখের পাশের হার ১৯৯৬ সালে ৫% থেকে ২০০৯ সালে ৭৫% উত্তীর্ণ হয়।

এই বিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতা হিসেবে মেট্রিক ফেল করা ছিল আবশ্যক। পাশ হয়েও যদি আবেদন করেন তাহলে আপনাকে থাকতে হবে ওয়েটিং লিস্টে। লাদাখের শিক্ষামন্ত্রী সেওয়াং রিগজিং, দেশ-বিদেশে পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রনির্মাতা স্তানজিন দোরজাই এবং অল উইমেন্স ট্রাভেল কোর প্রতিষ্ঠাতা, ভারতে নারীদের সর্বোচ্চ বেসামরিক 'নারী শক্তি' পুরস্কারপ্রাপ্ত থিনলাস কোরোল এই সেকমলেরই শিক্ষার্থী। এরা সকলেই ৩-৫ বার করে মেট্রিক ফেল করেছিলেন!

বিদ্যালয়ের কক্ষগুলো ছিল মাটির তৈরি। লাদাখের যে এলাকায় বিদ্যালয়টি অবস্থিত, সেখানে বিদ্যুৎ, গ্যাসের কোনো পরিষেবা নেই। তাই জীবাশ্ম জ্বালানীর বদলে সৌরশক্তিতে নির্ভরশীল একটি ক্যাম্পাস বানান তিনি। প্রযুক্তির কারিকুরিতে মাইনাস ১৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট থেকে মাইনাস ২০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপেও ১৫-২০ ডিগ্রি থাকে সে ক্যাম্পাসের অন্দরমহল। ফ্রান্সের আর্থ আর্কিটেকচার সম্মেলনে ২০১৬ সালে সেরা স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক টেরা অ্যাওয়ার্ড জিতে নিয়েছে সেকমল স্কুল।

২০১৩ সালে সোনম ওয়াংচুক আবিষ্কার করেন 'বরফ-স্তুপা' নামে কৃষকদের জন্য যুগান্তকারী এক পদ্ধতি। শীতে জমাটবাঁধা বরফগুলো জমা করে গ্রীষ্মে গলিয়ে কৃষকদের চাষাবাদের পানির যোগান দেয়া হতো। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্মিত হয় বরফের প্রথম আধার। দোতলা বাড়ির সমান সেই আধারে পানি ধরত প্রায় দেড় লাখ লিটার। তিব্বতীয় বৌদ্ধ মঠগুলোর বৃত্তাকার পিরামিড ঘরানার আকারের জন্য সেগুলোকে 'মন্দির' না বলে বলা হয় 'স্তুপা'। সোনম ওয়াংচুকও তার বরফের আধারের নাম দিলেন Ice-stupa বা 'বরফ-স্তুপা'।

২০১৫ সালে লাদাখের ফুগটাল নদীর আকস্মিক গতিরোধ হয়ে ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ হ্রদ সৃষ্টি হল। এতে কৃষিকাজ ব্যাহতের সঙ্গে সঙ্গে বন্যার ঝুঁকিও বাড়তে থাকে। ত্রাতার ভূমিকায় আসলেন সোনম। কর্তৃপক্ষকে গাড়ি থেকে পেট্রোল চোরানোর পুরনো 'সাইফোন' পদ্ধতির কথা বললেন। মাইন বিস্ফোরণ দিয়ে হ্রদ খালি করা হলো। যা করতে গিয়ে প্লাবিত হলো গোটা এলাকা, ধ্বংস হলো এক ডজন সেতু। নিজ এলাকায় রত্ন চিনতে ভুল করলেও সিকিম সরকার ডেকে নেন সোনমকে। অনাকাঙ্ক্ষিত 'হ্রদ-সমস্যা' তাদেরই বেশি। সাইফোন পদ্ধতিতে সে এলাকার সুন্দর পথ্য লিখে দিলেন পরিবেশের চিকিৎসক সোনম।

এদিকে নিজ এলাকা লাদাখে থেমে নেই স্তুপার জয়যাত্রা। ২০১৫ সালে তারা তৈরি করলেন ৬৪ ফুটের স্তুপা। ইচ্ছে করলেই গিনেজ বুকে নাম লেখাতে পারতেন এই উচ্চতা নিয়ে। কিন্তু তাদের স্বপ্ন ১০০ ফুটের স্তুপা বানানোর এবং সেই পানি দিয়ে ৫০০০ গাছ লাগানোর।

২০০৮ সালে সোনম সিএনএন-আইবিএন কর্তৃক 'রিয়েল হিরোজ অ্যাওয়ার্ড'-এ ভূষিত হন। পুরস্কারের মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্ম-উৎসর্গকারীদের সম্মান জানান। সোনমের ওপর নির্মিত ডকুমেন্টরিও সেদিন প্রদর্শিত হয়েছিল। এরপর সোনম চলে যান ফ্রান্সে, আর্থ আর্কিটেকচার নিয়ে পড়তে।

হঠাৎ ২০০৯ সালের ডিসেম্বর নাগাদ তার কাছে অনেক ইমেইল, ফোন-কল আসতে থাকে। সাংবাদিক, শুভানুধ্যায়ীরা সবার কাছে জানেন তাকে নিয়ে সিনেমা হয়েছে, তার স্কুল দেখানো হয়েছে,। সোনম স্কুলে ফোন করে জানতে পারলেন, ২০০৮ এর এপ্রিলে একটা শুটিং ইউনিট এসেছিল সেকমল স্কুলে। কিন্তু মালসামান রাখবার জায়গা না পেয়ে অন্য স্কুলে শুট করেছে তারা।

২০১২ সালে মুখ খোলেন সোনম। জানান- আমির খানের সঙ্গে কথা হয়েছিল। তবে এর বাইরে সিনেমার ব্যাপারে তিনি কিছু জানেনও না, এমনকি এটি তার জীবনকে আশ্রয় করে বানানো কিনা, সে প্রশ্নেও তার বিন্দুমাত্র উৎসাহ নেই।

আপনিও হতে পারেন সেকমল অল্টারনেটিভ স্কুলের ছাত্র। এর জন্য আপনাকে তিব্বতীয় ভাষা কিংবা মেট্রিকে ফেলও করতে হবে না, এমনকি ভারতীয়ও হতে হবে না। নানান বিষয়ে ইংরেজি ভাষায় করতে পারেন এক-দুই সপ্তাহ মেয়াদী স্বল্পকালীন কোর্স। বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন www.secmol.org। তাহলে বুঝতেই পারছেন, সোনমের কি কোন প্রয়োজন আছে 'ফুংসুখ ওয়াংড়ু' হবার? নাকি সোনম ওয়াংচুকের কৃতিত্বগুলোই যথেষ্ট তার পরিচিতির জন্য? বরং আমির খান অভিনীত 'ফুংসুখ ওয়াংড়ু' চরিত্রটিই লজ্জা পাবে সোনম ওয়াংচুকের মত এক ব্যক্তির জীবনের কাছে।

ভয়েসটিভি/এএস
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/53563
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2021 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ