Printed on Sat Nov 28 2020 8:19:15 PM

তুর্কমেনিস্তান: যেখানে রয়েছে নরকের দরজা

আনজাম খালেক
বিশ্ব
নরকের দরজা
নরকের দরজা
তুর্কমেনিস্তান মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে কম জনসংখ্যার দেশ। এটি মধ্য এশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের একটি সার্বভৌম, প্রজাতান্ত্রিক ও স্থলবেষ্টিত দেশ। দেশটি বহু শতাব্দী ধরে একাধিক সভ্যতার সংযোগস্থল হয়ে রয়েছে।

মধ্যযুগে মারভ ছিলো ইসলামী বিশ্বের অন্যতম বড় নগরী এবং সিল্ক রোডের একটি গুরুত্বপূর্ণ যাত্রাবিরতিস্থল। মধ্য-পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত সিল্ক রোড ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের কাফেলার পথ। রুশ সাম্রাজ্য ১৮৮১ সালে তুর্কমেনিস্তানকে কুক্ষিগত করে। তুর্কমেনিস্তান পরে মধ্য এশিয়ায় বলশেভিক বিরোধী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

১৯২৫ সালে তুর্কমেনিস্তান তুর্কমেন সোভিয়েত সোস্যালিস্ট রিপাবলিক নামে সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি সংবিধিবদ্ধ প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে তুর্কমেনিস্তান স্বাধীন হয়ে যায় এবং ১৯৯২ সালে নতুন সংবিধান কার্যকর করে।

এদেশের উত্তরে কাজাকিস্তান ও উজবেকিস্তান, পূর্বে উজবেকিস্তান ও আফগানিস্তান, দক্ষিণে আফগানিস্তান ও ইরান এবং পশ্চিমে কাস্পিয়ান সাগর। আশগাবাত তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর।

তুর্কমেনিস্তানের আয়তন ৪ লাখ ৯১ হাজার ২১০ বর্গ কিলোমিটার এবং জনসংখ্যা ৫৬ লাখ ৬২ হাজার ৫৪৪ জন। মধ্য এশিয়ার প্রজাতন্ত্রগুলোর মধ্যে তুর্কমেনিস্তানের জনসংখ্যা সবচেয়ে কম।

তুর্কমেনিস্তানে জাতিগত গ্রুপের মধ্যে রয়েছে তুর্কমেন ৮৫ শতাংশ, উজবেক ৫ শতাংশ, রুশ ৪ শতাংশ এবং অন্যান্য ৬ শতাংশ। প্রধান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রয়েছে মুসলিম ৮৯ শতাংশ, খ্রিষ্টান ৯ শতাংশ এবং অন্যান্য ২ শতাংশ।

রাষ্ট্রপতি শাসিত প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় পরিচালিত হয়। রাষ্ট্রপতি হলেন একাধারে রাষ্ট্রের প্রধান ও সরকার প্রধান। তুর্কমেনিস্তানে বর্তমানে একদলীয় শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান, কিন্তু সম্প্রতি দেশটি বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ২০০৭ সালে গুর্বাংগুলি বের্দিমুহামেদভ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, তবে নির্বাচনটি বিদেশী পর্যবেক্ষকেরা ভুয়া আখ্যা দেন।

তুর্কমেনিস্তান পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে ১৯৯১ সাল থেকে গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং পানির সেবা বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। তুর্কমেনিস্তানের প্রশাসনিক এলাকা পাঁচটি প্রদেশ এবং একটি রাজধানী নগরী জেলায় বিভক্ত। সেগুলো হলো আশগাবাত নগরী, আহাল প্রদেশ, বলকান প্রদেশ, দাসোগুজ প্রদেশ, লেবাপ প্রদেশ ও মেরি প্রদেশ। প্রদেশগুলো আবার জেলায় বিভক্ত। এক্ষেত্রে গ্রাম বা নগরী জেলা হতে পারে।

আয়তনের দিক দিয়ে তুর্কমেনিস্তান বিশ্বের ৫২তম বৃহত্তম দেশ। দেশটি স্পেনের চেয়ে সামান্য ছোট এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের চেয়ে কিছুটা বড়।

তুর্কমেনিস্তানের অধিকাংশ এলাকা সমতল বা ঢেউখেলানো বালুকাময় মরুভূমি, যার মধ্যে স্থলে স্থলে বালিয়াড়ি দেখতে পাওয়া যায়। দক্ষিণে ইরানের সাথে সীমান্তে রয়েছে পর্বতমালা। দেশটির ৮০ শতাংশ জুড়ে রয়েছে কারাকুম মরুভূমি।

তুর্কমেনিস্তানের মধ্যভাগে তুরান অবনমিত ভূমি ও কারাকুম মরুভূমির প্রাধান্য রয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত বরাবর কোপেত ডাগ রেঞ্জের উচ্চতা কুহ-য়ে-রিজ পর্বত পর্যায়ে উচ্চতা প্রায় ২ হাজার ৯শ’ ১২ মিটার। দেশের পশ্চিমে গ্রেট বলকান রেঞ্জ এবং উজবেকিস্তানের সাথে দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে কৈতেনডাগ রেঞ্জ হলো অপর তাৎপর্যপূর্ণ উচ্চভূমি।

গ্রেট বলকান রেঞ্জের উচ্চতা মাউন্ট আরিয়ান পর্যায়ে ১ হাজার ৮৮০ মিটার। তুর্কমেনিস্তানের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের উচ্চতা কুগিতাংতাউ রেঞ্জের আইরিবাকায় ৩ হাজার ১৩৭ মিটার। তুর্কমেনিস্তান ও ইরানের মধ্যবর্তী সীমান্তের বেশির ভাগ জুড়ে আছে কোপেত ডাগ পার্বত্য রেঞ্জ।

তুর্কমেনিস্তানের নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে আমু দরিয়া, মুরঘাব ও তেজেন। কাস্পিয়ান সাগরের সাথে তুর্কমেনিস্তানের ১ হাজার ৭৪৮ কিলোমিটার লম্বা সৈকত রয়েছে।

কাস্পিয়ান সাগর সম্পূর্ণ ভূমি পরিবেষ্টিত এবং মহাসাগরের সাথে এর কোন সংযোগ নেই, তবে ভলগা-ডন খালের মাধ্যমে কিছু জাহাজ কৃষ্ণ সাগরে আসা-যাওয়া করে। তুর্কমেনিস্তানে প্রায় গ্রীষ্মমন্ডলীয় আবহাওয়া বিরাজ করে।

তুর্কমেনিস্তানের কারাকুম মরুভূমি বিশ্বের সবচেয়ে শুষ্ক মরুভূমিগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখানে কিছু কিছু স্থানের গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত মাত্র ১২ মিলিমিটার। মার্চ ও মে মাসের মধ্যবর্তী সময়ে বেশিরভাগ বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। শীতকাল মৃদু ও শুষ্ক।

দেশটির একমাত্র কোপেত ডাগ রেঞ্জে সবচেয়ে ভারি বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রাজধানী আশগাবাতে ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং আমু দরিয়া নদীর তীরবর্তী কারকি নগরীতে ৫১.৭ ডিগ্রি পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়েছে। গোটা সোভিয়েত ইউনিয়নে এক সময় এটাই ছিলো সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।

তুর্কমেন ভাষা এবং রুশ ভাষা তুর্কমেনিস্তানের সরকারি ভাষা। তুর্কমেন ভাষায় এখানকার জনগণের প্রায় ৮০% এবং রুশ ভাষায় প্রায় ৮% কথা বলে। এখানে প্রচলিত অন্যান্য ভাষার মধ্যে আছে বেলুচি ভাষা ও উজবেক ভাষা।

তুর্কমেনিস্তান বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস সম্পদ মজুদের অধিকারী। দেশটির বেশিরভাগ কারাকাম বা কালো বালির মরুভূমিতে আবৃত। তুর্কমেনিস্তান মরুভূমির দেশ হওয়ায় মরূদ্যানগুলোতে সেচের মাধ্যমে চাষাবাদ হয়।

তুলা ও গম প্রধান ফসল। তুলা রফতানি করা হয় এবং দেশের মানুষ প্রধান খাদ্য হিসেবে গম খেয়ে থাকে। তবে অনেক গবাদি পশুও এদেশে পালন করা হয়। তা ছাড়া এদেশে আছে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মজুদ।

তুর্কমেনিস্তান গ্যাস, অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিকেল, বস্তু ও তুলা রফতানি করে এবং যন্ত্রপাতি, কেমিক্যাল ও খাদ্যদ্রব্য আমদানি করে। চীন, তুরস্ক, ইতালি, আফগানিস্তান, রাশিয়া, জাপান, জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে এদেশের বাণিজ্যিক লেনদেন হয়ে থাকে। এদেশের মুদ্রার নাম তুর্কমেন নিউ মানাত।

তুর্কি ঘোড়া হচ্ছে মধ্য এশিয়ার পশুচারণকারী নানা উপজাতিদের ব্যবহৃত তেজি ঘোড়া। তুর্কোমেন উপজাতির লোকেরা মূলত ছিল মধ্য এশিয়ার স্তেপ তৃণভূমি অঞ্চলের তুর্কি ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ। এদের মধ্যে যারা বিস্তীর্ণ তৃণভূমি অঞ্চলের পশ্চিম অঞ্চলে বাস করত তাদের বলা হত অঘুজ উপজাতি।

এরা ছিলো মোঙ্গলদের একটি শাখা। এদের বলা হতো অঘুজ টার্ক বা অঘুজ তুর্কি- ধারাবিবরণী রক্ষকদের লেখায় এদেরই আবার অন্য নাম ছিল তুর্কমেন। এরা এশিয়ার বৃহত্তম লবণাক্ত জলের হ্রদ ক্যাস্পিয়ান সাগরের পূর্বতীরে গড়ে তুলেছিল এদের বাসস্থান –তুর্কমেনিস্তান। হ্রদের পশ্চিমদিকে বাস করে এদেরই আরেক গোষ্ঠী তুর্কিরা, যাদের বাসভূমির নাম তুরস্ক।

তুর্কমেনিস্তানে দেখার মত একটি জায়গা হ’ল ‘ডোর অফ হেল’ বা নরকের দরজা। সবাই ভাববে নরকের দরজা আবার দেখবার মত কী হল! সত্যিই দেখবার মত বটে, তাইতো নানা দেশ থেকে এখন অনেক পর্যটক আসে এই প্রাকৃতিক গ্যাসের অগ্নিগহ্বর দেখতে।

কারাকোরাম মরুর বুকে দারভাজা অঞ্চলে গত ৩৮ বছর ধরে জ্বলছে এই নরকের দ্বারের অগ্নিকুণ্ড। পৃথিবীর শুষ্কতম মরুভূমিগুলির মধ্যে একটি কারাকোরামের বুকেই এই দেশ। তার মধ্যে প্রায় ৬০ মিটার বিস্তৃত আর ২০ মিটার গভীর এই আগুনে ক্রেটার।

কিন্তু এই ক্রেটার বা জ্বালামুখ কোনও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সৃষ্টি হয়নি। ১৯৭১ সালে সোভিয়েতের প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান প্রকল্পের এক দুর্ঘটনার ফলে এটির সৃষ্টি হয়েছিল।

অফুরন্ত প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডার দারভাজাতে গ্যাস উত্তোলনের জন্য রাশিয়ার সরকারের তরফে মাটিতে ড্রিল করার সময় ভুলবশত যে জায়গাটিতে ফুটো করা শুরু হয়, ঠিক সেই জায়গাটির সামান্য নীচেই ছিল বিপুল গ্যাসের আধার। সামান্য চাপ পড়তেই পুরো এলাকাটি মাটিতে বসে গেল, সৃষ্টি হ’ল বিরাট গহ্বর। ড্রিলিংএর যন্ত্রপাতিসহ অনেক কিছুই চলে গেল সেই গহ্বরে। বিরাট এক দুর্ঘটনা ঘটল।

ভূবিজ্ঞানীরা চিন্তা করলেন, এই উদগীর্ণ বিষাক্ত গ্যাসে মানুষের ক্ষতি কীভাবে আটকানো যায়। তাঁরা মনে করলেন এই বেরিয়ে আসা গ্যাসকে জ্বালিয়ে দিলে দিন কয়েকের মধ্যেই তা নিঃশেষ হয়ে যাবে। কিন্তু হিতে বিপরীত হল। আগুনের ছোঁয়া পেয়ে মাটির নীচেকার গ্যাসের দীর্ঘ ভাণ্ডার থেকে গ্যাস বেরিয়ে জ্বলতেই লাগল।

এই দীর্ঘ গ্যাসের ধারা আজও জ্বলে চলেছে রাবণের চিতার মত। কবে যে তা নিভবে তা কেউ জানেনা। অন্ধকারের রাতেও বহুদূর থেকে দেখা যায় আগুনের লেলিহান শিখা, বাতাসে ভরে থাকে জ্বলন্ত সালফারের গন্ধ। রাতের অন্ধকারে সে দৃশ্য অপূর্ব। তাই দলে দলে পর্যটকেরা আসেন সেই আশ্চর্য ‘নরকের দরজা’ দেখতে। এ আগুনের শেষ কোথায় কেউ জানে না।

পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস আর তেলের ভাণ্ডার এই দেশটির অভ্যন্তরে দারিদ্র্যতা চরম, আর বিদেশের কাছে ঋণের বোঝা অনেক। যদিও তুর্কমেনিস্তান হিন্দুকুশ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, আর একটি তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ মধ্য এশিয়ার দেশগুলিতে, আর দক্ষিণের প্রতিবেশী দেশগুলিতে প্রচুর পরিমাণে সরবরাহ করে।

সেচের মাধ্যমে উৎপন্ন কৃষিজাত ফসলের মধ্যে তুলা উৎপাদনে বিশ্বের নবম বৃহৎ তুলা উৎপাদনকারী দেশ। দেশে সকলের শিক্ষা বাধ্যতামূলক। বারো বছর স্কুলজীবনের তিনটি স্তর। প্রাথমিক স্কুল তিন বছরের তিনটি গ্রেড। হাইস্কুলে লাগে ৫ বছর। সেকেণ্ডারি স্কুলের সময় সীমা ৪ বছর।

তুর্কমেনিস্তানের জনগণের মধ্যে অধিক সংখ্যায় আদি তুর্কমেন জনগণ ছাড়াও আছে উজবেক, রাশিয়ান, কাজাক, তাতার, কুর্দ, বালুচ প্রমুখ অনেক জাতির মানুষ। ইসলাম, খ্রিষ্টান, আর ধর্মহীন মানুষের বাস এখানে।

ফল, দুধ, বেরি, মাশরুম, মাংস, মাটির নীচের কন্দমূল, গাজর ইত্যাদি থাকে খাদ্য তালিকায়। নানাধরনের পাখির মধ্যে আছে চড়ুই, ঈগল, শকুন আর কিছু পরিযায়ী পাখি। এদের সংস্কৃতির প্রধান চিহ্ন ঘোড়া। সরীসৃপের মধ্যে আছে সাপ, টিকটিকি ইত্যাদি।
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/19642
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2020 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ