Printed on Mon Jul 26 2021 4:39:29 AM

নানা গ্যাড়াকলে বন্দি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য শিল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয়ভিডিও সংবাদ
নানা গ্যাড়াকলে
নানা গ্যাড়াকলে
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী খাত। এ খাতে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৬ লাখ এবং পরক্ষভাবে আরও ৩ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। বাংলাদেশের মোট রপ্তানির মধ্যে এ খাতের অবদান ৪%, যা দেশের মোট জিডিপির ০.৫%। সরকার চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যকে ২০১৭ সালে ‘প্রোডাক্ট অব দ্যা ইয়ার ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ২০২৪ সাল নাগাদ এখাত থেকে মোট রপ্তানি আয় বৃদ্ধি করে ৫ বিলয়ন মার্কিন ডলার এবং মোট জিডিপর ১% করার করার জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সারা বছর দেশে প্রায় ২ কোটি ৩১ লাখ গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া জবাই হয়। এর অর্ধেকই হয় কোরবানির ঈদে। গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া মিলিয়ে দেশে কোরবানি হয়েছে প্রায় ১ কোটি ১৬ লাখ পশু। এসবের ওপর ভরসা করেই এ বছর ৫ হাজার কোটি টাকা রফতানি আয়ের সরকারি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু নানান সংকটের মধ্যে এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।

অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রপ্তানিতে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। চামড়ার জুতা রপ্তানিতে এসেছে ঈর্ষণীয় সাফল্য। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, চামড়াশিল্প বিকাশের জন্য দরকার সরকার ও উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি নিশ্চিত করা।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সম্প্রতি প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের (২০২০-২১) প্রথম মাস জুলাইয়ে দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে রপ্তানি আয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৬.২২ শতাংশ বেশি হয়েছে। এই সময় আয় হয়েছে প্রায় ৯ কোটি ডলার। লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাত কোটি ৭৩ লাখ ডলার। এর আগের অর্থবছরে জুলাইতে আয় হয় ১০ কোটি ৬১ লাখ ডলার। এ ছাড়া এই সময় চামড়ার জুতা রপ্তানি করে আয় হয় পাঁচ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। এই আয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩১.৩৪ শতাংশ বেশি।

কভিড-১৯-এর কারণে এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের প্রায় ২০ কোটি ডলারের কার্যাদেশ স্থগিত হয়ে পড়ে। এই সময় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা ছিল ভঙ্গুর। তবে সম্প্রতি সরবরাহব্যবস্থা কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার ফলে অন্য খাতের মতো রপ্তানি আয় কিছুটা আলোর মুখ দেখছে। স্থগিত হওয়া পণ্য জাহাজীকরণ শুরু হয়েছে।

করোনায় বিশ্ববাজারে স্থবিরতা, চাহিদা কমে যাওয়া এবং সাভার ট্যানারিপল্লীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের কাজ শেষ না হওয়ায় দেশের চামড়া খাত বড় একটা ধাক্কা খেয়েছে। ফলে ৭০ শতাংশ পণ্য মজুদ হয়ে পড়ে। আশার বিষয় হচ্ছে, পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসায় ক্রেতারা আবার তাদের পণ্য নিতে শুরু করেছে। এ ছাড়া চামড়ার জুতার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ নতুন কার্যাদেশ এসেছে।

চামড়াজাত পণ্য বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি পণ্য হওয়া সত্ত্বেও সিন্ডিকেটের কারসাজিতে শিল্পটি বিপন্ন হতে চলেছে। তৃণমূল পর্যায়ে বিক্রেতা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের চামড়ার ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার পেছনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সঙ্গে সিন্ডিকেটের দৌরাত্মও রয়েছে। এ দুইয়ের কারসাজিতে চামড়া শিল্প আজ মুখ থুবড়ে পড়েছে। জানা গেছে, চামড়া শিল্পে সংকটের নেপথ্যে রয়েছে ২৯টি কারণ।

কারণগুলো হচ্ছে- ১. সঠিক পরিকল্পনার অভাব, ২. সাভারে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণ কাজ শেষ না করে কারখানা স্থানান্তর করা, ৩. সাভারে ট্যানারিপল্লীতে অবকাঠামোগত সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করা, ৪. নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ও সময়মত গ্যাস সংযোগ দিতে না পারা, ৫. লোডশেডিং, ৬. জেনারেটর ব্যবস্থা ভালো না হওয়া, ৭. সড়ক যোগাযোগে অব্যবস্থাপনা, ৮. চামড়া কাটার পর বর্জ্য কোথায় ফেলা হবে সেটি নির্ধারণ করতে না পারা, ৯. জমির দলিল হস্তান্তরসহ নানা বিষয় নিয়ে চামড়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব, ১০. তিন বছরেও সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে প্রত্যাশা অনুযায়ী সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারা, ১১. কারখানা স্থানান্তরের পরও অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে যেতে না পারায় রফতানি আদেশ বাতিল হয়ে যাওয়া, ১২. হাজারীবাগে ২০৫ টি কারখানা থাকলেও সাভারে মাত্র ১৫০টি প্লট বরাদ্দ দেয়া, ১৩. প্লট না পাওয়া ৫৪টি কারখানা বন্ধ হওয়ায় এসব কারখানার শ্রমিকদের বেকার হয়ে যাওয়া, ১৪. অবৈধ পথে চামড়া পাচার, ১৫. বিশ্ব বাজারের দরপতনে দেশের চামড়া শিল্পের অবস্থান আন্তর্জাতিক বাজারে দুর্বল হয়ে যাওয়া, ১৬. টানা কয়েক বছর ধরে চামড়া রফতানি আয় কমে যাওয়া, ১৭. আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পণ্যের আধুনিকায়নে সামঞ্জস্যতা না থাকা, ১৮. চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধ, ১৯. বিশ্ববাজারে চামড়ার জুতার পরিবর্তে সিনথেটিক বা কাপড় জাতীয় জুতার আগ্রহ বৃদ্ধি, ২০. চামড়াজাত পণ্যের উৎপাদন কমে যাওয়া, ২১. চামড়া শিল্পকে পরিবেশবান্ধব করে গড়ে না তোলা, ২২. ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী কারখানার পরিবেশ উন্নত না করা, ২৩. চাহিদার তুলনায় ব্যাংক ঋণ না পাওয়া, ২৪. পুঁজি সংকট, ২৫. দক্ষ শ্রমিকের সংকট, ২৬. গতবারের চামড়া এখনো প্রক্রিয়াজাত করতে না পারা, ২৭. আগের বছরের সংগৃহীত কাঁচা চামড়ার গুণগত মান কমে যাওয়া, ২৮. নতুন চামড়া সংরক্ষণে স্থান সংকট এবং ২৯. আমলাতান্ত্রিক জটিলতা।

এদিকে, পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে মোট এক কোটি বর্গফুট ওয়েট ব্লু চামড়া রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে সরকার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থা প্রধান আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সম্প্রতি এসব প্রতিষ্ঠানকে চামড়া রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে।

পশুর শরীর থেকে প্রথমে চামড়া ও পরে পশম ছাড়িয়ে প্রক্রিয়াজাত করার পর যে চামড়া পাওয়া যায় তাকেই ওয়েট ব্লু চামড়া বলা হয়। ১৯৯০ সালের আগপর্যন্ত এ ধরনের চামড়া বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হতো। এ ছাড়া বাংলাদেশ থেকে সব সময় চীন, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, জাপান ও স্পেনের মতো দেশে ‘ক্রাস্ট’ ও ‘ফিনিশড লেদার’ রপ্তানি হয়ে আসছে। সেখানে অবশ্য ধস নেমেছে কিছুটা।

এএসকে ইনভেস্টমেন্ট, কাদের লেদার কমপ্লেক্স, আমিন ট্যানারি লিমিটেড, লেদার ইন্ডাস্ট্রিজ অব বাংলাদেশ লিমিটেড এবং কালাম ব্রাদারসকে এ দফায় ওয়েট ব্লু চামড়া রপ্তানির অনুমতি দেয়া হয়। অনুমতির মেয়াদ বহাল থাকবে ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশে ঈদুল আজহায় ১ কোটি ১০ লাখের মতো পশু জবাই হয়। এগুলোর মধ্যে ৪০ থেকে ৪৫ লাখ গরু-মহিষ। কোভিডের কারণে এবার কোরবানির পরিমাণ কমতে পারে। ঈদুল আজহায় জবাই হওয়া গরুর স্বাস্থ্য ভালো থাকে বলে চামড়ার মানও খুব ভালো হয়। তাই ট্যানারিগুলো মোট চামড়ার ৫০ শতাংশই সংগ্রহ করে ঈদুল আজহায়।
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/49086
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2021 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ