Printed on Mon Apr 12 2021 12:17:46 PM

সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি ছিল ব্যক্তিগত পালকি

অনলাইন ডেস্ক
পশ্চিমবঙ্গ
পালকি
পালকি
ছন্দের যাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার পালকি কিন্তু শুধু গ্রামের মেঠো পথের নয়। ব্রিটিশ কলকাতায়ও যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম ছিল এই পালকি। ছাপোষা মধ্যবিত্ত থেকে ধনী বাবু প্রত্যেক শ্রেণির মানুষ সওয়ার হতেন চতুর্দোলায়। অষ্টাদশ শতকে পালকিই ছিল সঙ্গতিপন্ন কলকাতার বাহন। ঘোড়ার গাড়ি আসার পরেও কিন্তু পালকির প্রচলন কমেনি। বাঙালি এবং ইওরোপীয়, দু’পক্ষেরই পছন্দের বাহন ছিল পালকি।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত পালকি এবং বেহারা রাখতেন। তারা আবার তাদের অধস্তন কর্মীদের পালকি রাখা পছন্দ করতেন না। কারণ পালকি চড়া ছিল সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠিও। কিন্তু সেই বিধিনিষেধ উপেক্ষা করেই সকল শ্রেণির ইওরোপীয়রা পালকিতে সওয়ার হতেন।

রাধারমণ মিত্রের ‘কলিকাতা-দর্পণ’ বইয়ে বলা হয়েছে, ডেভিড হেয়ার, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো মনীষীরা ঘোড়ার গাড়ির তুলনায় বেশি পছন্দ করতেন পালকিই। হেয়ার সাহেব কোনও দিন এক্কাগাড়ি বা ঘোড়ার গাড়ি চড়েননি। তার বাহন ছিল পালকিই। পাশাপাশি, সম্ভ্রান্ত বাড়ির মেয়ে-বউরা পালকি করেই যেতেন গঙ্গাস্নানে। পালকিসমেত গঙ্গায় তাদের চুবিয়ে দেয়া হত। তারা লোকচক্ষুর অন্তরালেই সারতেন গঙ্গাস্নান।

পালকি

কলকাতায় পালকি বেহারার কাজ করতেন দুলে ও বাগদি শ্রেণির মানুষ। কিন্তু পরে তাদের জায়গা নিয়ে নেয় অবাঙালি বেহারা। তারা মূলত ছিলেন হিন্দুস্তানি এবং ওড়িয়া। ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে ‘রাজা’ উপাধি পাওয়ার পরে নবকৃষ্ণ দেব ওড়িশা ও হিন্দিবলয় থেকে বেহারাদের আনিয়েছিলেন। কারণ দুলে, বাগদি তার কাছে ছিল ‘অস্পৃশ্য’। ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় একজন হিন্দুস্তানি পালকি বেহারার প্রতি মাসে বেতন ছিল ৪ টাকা। ওড়িয়া বেহারা পেতেন ৫ টাকা।

এখন যেমন কলকাতাবাসীর বাহন দু’রকম। হয় নিজস্ব গাড়ি, নয়তো অ্যাপ থেকে ভাড়া করা গাড়ি বা বাস। আজ থেকে ১৭০ বছর আগেও কলকাতার ছবিটা ছিল কমবেশি এইরকমই। কারও নিজের পালকি থাকত। কেউ আবার পালকি ভাড়া করতেন। স্বভাবতই ব্যক্তিগত পালকি ছিল ভাড়া করা পালকির তুলনায় অনেক বেশি বাহারি।

বেতের বোনা নিজস্ব পালকিতে থাকত গদি। আরোহীর পিঠের দিকে এবং দু’পাশে থাকত নরম তাকিয়া। ভাড়া পালকিতে গদি-তাকিয়া মোড়া থাকত খুব সরু কাঠির মাদুর অথবা শীতলপাটি দিয়ে। ব্যক্তিগত পালকিতে সে জায়গা নিত মরক্কো চামড়া। পালকির সাজ কেমন হবে, তার জন্যেও লাগত অনুমতি। ব্রিটিশ শাসনামল শুরুর আগে মুঘলদের অনুমতি সাপেক্ষে সমাজের বিশিষ্ট অভিজাতরা ব্যবহার করতেন রেশমের ঝালর লাগানো পালকি।

পালকি

সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যেত পালকির সজ্জা। সেইসঙ্গে পালকির আগে পিছে চলা বাহিনীও। পালকির সওয়ার যত গণ্যমান্য, তত লম্বা হত সেই বাহিনীর যাত্রা। পালকির সামনে এবং পিছনে থাকতেন মশালচি, পেয়াদা, পাইক, বরকন্দাজ, হরকরার দল। বিশেষ বিশেষ জায়গায় বদলে যেত বেহারাও।

শ্রীপান্থর ‘কলকাতা’ থেকে জানা যায়, সে সময়কার পালকি বেহারাদের নৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন ইটালি থেকে আসা চিত্রশিল্পী বালসাজার। তাদের দক্ষতা সম্বন্ধে তিনি লিখেছেনও। বলেছেন, আরোহীকে কিছুমাত্র টের পেতে না দিয়ে যে ভাবে তারা কাঁধবদল করেন, তা বিস্ময়কর। শুধু অফিস-কাছারি, নতুন কনের শ্বশুরবাড়ি বা অভিজাত পরিবারের বধূর গঙ্গাস্নানই নয়। পালকিতে চেপে বাঙালি যেত তীর্থযাত্রায়ও।

পালকি

এর পর এলো ঘোড়ার গাড়ি। তার সঙ্গেও পালকি পাল্লা দিয়েছিল। তার পর ঘোড়ায় টানা ট্রামের পাশেও প্রতিযোগিতা থেকে হারিয়ে যায়নি চতুর্দোলা। কারণ এই দু’টি বাহনই ব্যক্তিগত মালিকানার পাশাপাশি ঠিকাও ছিল। কিন্তু তাদের পরে যা এল, সেই মোটরগাড়ির সঙ্গে টেক্কা দেয়া গেল না। এরপর হারিয়ে যেতে শুরু করে পালকি।

আরও পড়ুন: শত পাত্রের ‘বউ’ সেজে কোটিপতি

ভয়েস টিভি/এসএফ
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/39799
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2021 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ