Printed on Thu Feb 25 2021 1:03:34 PM

বিদেশি ফল-সবজি চাষে বাড়ছে আয়, মিটছে পুষ্টি চাহিদা

সোহাগ ফেরদৌস
জাতীয়
পুষ্টি
পুষ্টি
বাংলাদেশে শীতকালে সবজি আর গরমে দেশি ফলের দেখা মেলে। বছরের বাকি দীর্ঘ সময় নির্ভর করতে হয় বিদেশি ফলের ওপর। আমদানি করা ফল-সবজির দাম বাড়তি থাকায় সাধারণের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকে না বললেই চলে। তাই বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময় বাদ দিলে বাকি সময়ে পুষ্টি ঘাটতি পূরণ সম্ভব হয় না।

তবে দেশে এখন প্রচুর বিদেশি ফল এবং সবজি চাষ শুরু হয়েছে। এতে ঘুচেছে আগের দুর্দিন। এখন শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তাদের হাত ধরেই বিদেশি ফল-সবজি চাষ বাংলাদেশকে নুতন স্বপ্ন দেখাচ্ছে। এছাড়া দেশের কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করছে। এতে দেশে এখন ফল উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ টন ছাড়িয়েছে। ফলে বিদেশ নির্ভরতা কমার পাশাপাশি কমছে চাকরি নির্ভরতাও। সেই সাথে বাড়ছে আয় আর মিটছে পুষ্টি চাহিদা।

শস্য উৎপাদন বিশেষজ্ঞ ড. মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, পেয়ারা, পেঁপে, নারিকেল, গাবের মতো ফলগুলোর ব্যাপক উৎপাদন বাড়ছে বিদেশি প্রজাতির কারণে। বিশেষ করে পেয়ারা ও পেঁপে - এ ফল দুটির এখন ব্যাপক উৎপাদন হচ্ছে ও প্রায় সারাবছরই কাঁচা ও পাকা আকারে এ ফল দুটি পাওয়া যায় এবং দাম তুলনামূলক অন্য ফলের চেয়ে কম বলে সাধারণ মানুষের পুষ্টির একটি সহজলভ্য উৎসে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশেই এখন ড্রাগন, বারোমাসি থাই আম, স্ট্রবেরি, মাল্টা, পার্সিমন, কাশ্মিরি কমলা, তরমুজ, সৌদি খেজুর, এলাচ, থাই পেয়ারা, থাই ও তাইওয়ানী জাতের পেপে, ভিয়েতনামী নারকেল, বিদেশি কলাসহ বিভিন্ন ফল চাষ হচ্ছে।

প্রায় সতেরো বছর আগে বাংলাদেশে পরীক্ষামূলকভাবে ড্রাগন ফলের চাষ করা হয়। এ ফল চাষের জন্য বাংলাদেশের আবহাওয়া এবং মাটি উপযোগী হওয়ায় এর ফলন এখন দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে নাটোর অঞ্চলে ড্রাগন ফলের চাষ লাভজনক হওয়ায় এর চাষ ক্রমেই বাড়ছে। ২০০৩ সালে দেশের প্রখ্যাত ফল গবেষক ও উদ্ভাবক এস এম কামরুজ্জামানের তত্ত্বাবধানে নাটোরের মডার্ন হর্টিকালচার সেন্টারে থাইল্যান্ড থেকে আনা ড্রাগনের প্রথম অভিষেক ঘটে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব হর্টিকালচার বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো আশরাফুল ইসলাম বলেন, বিদেশি ফল চাষ প্রসঙ্গে বলতে গেলে সবার আগে বলতে হয় ড্রাগন ফলের কথা। এটি আমাদের দেশের আবহাওয়ায় খুবই উপযুক্ত। চাহিদার দিক থেকেও আশাব্যঞ্জক। এতে পানি বেশি লাগে না। গোবর সার হলেই হয়। মে, জুন, জুলাই আমরা গ্রীষ্মের ফলগুলো পাই। এরপর একটা গ্যাপ হয়। সে সময়ে ড্রাগন ফলের মাধ্যমে চাহিদা পূরণ সম্ভব।’

ড্রাগন ছাড়াও দেশে প্রচুর পরিমাণে বিদেশি পেয়ারা, পেপে, নারকেল এবং সমতলে চাষ হচ্ছে কমলা এবং মাল্টা। একটা সময় দেশে শীতকালে ফলের আকাল দেখা দিত। তবে এখ শীতকালে আম, কমলা ও মাল্টা বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।

দেশের ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর এবং চুয়াডাঙ্গা জেলায় কমলা চাষে বিপ্লব ঘটিয়েছেন সেখানকার চাষীরা। এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের পিরোজপুর, ঝালকাঠিসহ বিভিন্ন জেলায় মাল্টা ও পেয়ারার চাষ বেড়েছে।

সবজি

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রিকালচার অনুষদের ডিন ড. মো. আব্দুর রহিম বলেন, ‘আমরা অবশ্যই বিদেশি ফল চাষ করতে চাই। এ জন্য উদ্যোগও নিয়েছি। এমনভাবে চাষ করতে চাই যাতে মৌসুম ছাড়াই ফলের চাহিদা পূরণ করতে পারি। যেমন শীতকালে আম, আর ড্রাগনের চাষ করা হচ্ছে। সারাবছরই মাল্টার চাষ করা হচ্ছে এখন। কাটিমন আম এখন গ্রামেই চাষ করা হচ্ছে। এই আম শীতকালে আমরা খেতে পারবো। এটি বেশ মিষ্টিও। তবে এখনও বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসেনি। গবেষণা চলছে। ড্রাগন ফল আমরা সারাবছরই চাষ করছি। আগামী ৫ বছরের মধ্যে আমরা সারাবছর নানা জাতের বিদেশি ফল উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে পারবো বলে আশা করি।’

এছাড়াও ইতালিয়ান সবজি স্কোয়াশ, লেটুসপাতা, চায়নিজ পাতা, ক্যাপসিকাম, বিট রুট, ব্রকলি, রেড ক্যাবেজ, ফ্রেঞ্চ বিন, সুইট কর্ন, বেবি কর্ন, থাই আদা, থাই তুলসী, লেমনগ্র্যাস, স্যালারি পাতা, শিমলা মরিচ, চায়নিজ ক্যাবেজসহ বিভিন্ন বিদেশি সবজি দেশেই চাষ হচ্ছে। এছাড়াও দেশের কৃষি গবেষণার কল্যাণে সারাবছরই সবজি পাওয়া যাচ্ছে।

স্কোয়াশ

বগুড়ার তিনটি উপজেলা শিবগঞ্জ, গাবতলী ও শাজাহানপুরে প্রচুর পরিমাণে বিদেশি সবজি চাষ হচ্ছে। দুই যুগ আগে শিবগঞ্জ উপজেলার বুজরুক শোকড়া গ্রামের কৃষক আনছার আলীর হাত ধরে বিদেশি সবজি চাষ শুরু হয়। এছাড়াও ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলায় চাষ হচ্ছে ইতালিয়ান পুষ্টি সমৃদ্ধ সবজি স্কোয়াশ। কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ব্রকলি উৎপাদন বেড়েছে অনেক। দেশেই এসব বিদেশি সবজির ফলন ভালো হওয়ায় অনেক শিক্ষিত তরুণই সবজি চাষে নিজেদের ভাগ্য বদলের চেষ্টা করছে।

এসব ফল-সবজি আমাদের দৈনন্দিন পুষ্টি চাহিদা মেটাতে সহায়ক হয়েছে বলে জানান কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের সহাকারী অধ্যাপক শাম্মী আক্তার। তিনি জানান, এখন দেশের বাজারে সব সময়ই ফল এবং সবজি থাকছে। এ কারণে সাধারণ মানুষও কিনতে পারছে এবং তাদের পুষ্টি চাহিদা মেটাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বিদেশি ফল-সবজি চাষ দেশ ও দেশের মানুষের জন্য অবশ্যই কল্যাণকর। তবে অধিক মুনাফা লাভের আশায় কৃষকদের অতিরিক্ত ক্যামিকেল ব্যবহার উচিত হবে না। এজন্য স্থানীয় কৃষি অফিসের নজরদাড়ি থাকা প্রয়োজন।

শাম্মী আক্তার আরও বলেন, পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার খেতে গিয়ে যেন স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি না হয় এ বিষয়টি সব সময় মনে রাখা দরকার। অপরিণত ফল সবজি বেশি লাভের আশায় যাতে বাজারজাত করতে না পারে এজন্য সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকা জরুরি।

তিনি বলেন, এতে হয়তো কিছু সংখ্যক মানুষ লাভবান হবে তবে, তবে সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়বে এবং আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আরও পড়ুন: ড্রাগন ফল চাষে সফল ঠাকুরগাঁওয়ের শিক্ষক আবু জাফর

ভয়েস টিভি/এসএফ
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/36350
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2021 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ