Printed on Tue Jun 28 2022 6:32:50 AM

দিনাজপুর গড়ে প্রতিদিন ১৬ তালাক, অনুপাত হারে এগিয়ে নারীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
সারাদেশ
প্রতিদিন ষোল তালাক
প্রতিদিন ষোল তালাক
২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী মুসলিম শরিয়াহ মোতাবেক বিয়ের রেজিস্ট্রি হয়েছে ১৫ হাজার ৮০২টি। আর আইনের মাধ্যমে তালাক হয়েছে ছয় হাজার ১২৪টি। হিসাব অনুযায়ী বিয়ের অনুপাতে বিচ্ছেদের পরিমাণ ৩৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। আর গড়ে প্রতিদিন ১৬টির বেশি তালাকের ঘটনা ঘটেছে। মোট বিয়ে বিচ্ছেদের মধ্যে ছেলের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত এক হাজার ১৮০টি এবং মেয়ের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত দুই হাজার ৫৫৫টি। আর ছেলে-মেয়ে উভয়ের সিদ্ধান্তে তালাক হয়েছে দুই হাজার ৩৮৯টি। তথ্য বলছে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তে পুরুষদের তুলনায় নারীরা এগিয়ে। দিনাজপুর জেলা রেজিস্ট্রার অফিস সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

হিসাব বলছে- ২০২০ সালে বিয়ের অনুপাতে বিচ্ছেদ হয়েছে ৪৫ দশমিক ০৮ শতাংশ, ২০১৯ সালে ৩৬ দশমিক ১৮ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৩৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ। আর ২০১৭ সালে বিচ্ছেদের হার ছিল ৩৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

এ পরিসংখ্যান থেকে বোঝাই যায় যে, উত্তরের জেলা দিনাজপুরে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে বিয়ে বিচ্ছেদ বা তালাক। বিচ্ছেদের মূল কারণ হিসেবে মাদক, নারী নির্যাতন, মোবাইলফোনে আসক্তি, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক, একে অপরকে না বোঝা, স্বাবলম্বী নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি সচেতনতার অভাবকে দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন- বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তে পুরুষদের তুলনায় নারীরা এগিয়ে।

দিনাজপুর জেলা রেজিস্ট্রার অফিস সূত্রে জানা যায়, দিনাজপুরে ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মুসলিম শরিয়াহ অনুয়ায়ী বিয়ে হয়েছে ১৫ হাজার ৮০২টি। আর তালাক হয়েছে ছয় হাজার ১২৪টি। বিয়ের অনুপাতে বিচ্ছেদের পরিমাণ ৩৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এর মধ্যে ছেলের পক্ষ থেকে তালাক দিয়েছে ১ হাজার ১৮০ জন। আর মেয়ের পক্ষ থেকে তালাক দিয়েছে দুই হাজার ৫৫৫ জিন। অন্যদিকে ছেলে-মেয়ে উভয়েই তালাক দিয়েছে দুই হাজার ৩৮৯ জন।

দিনাজপুরে ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিয়ে হয়েছে ১২ হাজার ২৬৭টি, আর তালাক হয়েছে পাঁচ হাজার ৫৩০টি। বিয়ের অনুপাতে বিচ্ছেদের পরিমাণ ৪৫ শতাংশ। এর মধ্যে ছেলের পক্ষ থেকে তালাক দিয়েছে ৯৭৭ জন। আর মেয়ের পক্ষ থেকে তালাক দিয়েছে দুই হাজার ২১৩ জন। অন্যদিকে ছেলে-মেয়ে উভয়েই তালাক দিয়েছে দুই হাজার ৩৪০ জন।

২০১৯ সালে বিয়ে হয় ১৫ হাজার ৬৮৮টি, আর তালাক হয় পাঁচ হাজার ৬৭৬টি। ২০১৮ সালে বিয়ে হয় ১৫ হাজার ৫৫৯টি, আর তালাক হয় পাঁচ হাজার ২০৮টি এবং ২০১৭ সালে বিয়ে হয় ১৪ হাজার ২৬৪টি, আর তালাক হয় পাঁচ হাজার ৩৪৫টি।

তালাকের নিয়ম অনুযায়ী, তালাকের সিদ্ধান্তের পর কাজী অফিস থেকে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে চিঠি পাঠানো হয়। তালাকের পর পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ ৯০ দিন সময় পান সালিশ করে তালাকের চূড়ান্ত পরিণতি সম্পন্ন করার।

এসব বিষয়ে কথা হলে এক নারী বলেন, আমি তালাক দিতে চেয়েছি, কারণ আমার স্বামী নির্যাতন করতো। সংসারের চেয়ে বাইরেই বেশি সময় দিতেন। পরিবারে অশান্তি লেগেই ছিল। আমার স্বামী মাদকেও আসক্ত। বারবার আমার সংসারের ক্ষতি করেছে। এভাবে চললে তো সন্তানকে মানুষ করতে পারবো না। তাই বাধ্য হয়েই তালাকের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

কথা হলে হবিবর রহমান নামে এক ব্যক্তি বলেন, প্রথম দিকে মনে হচ্ছিল যে ও (তার স্ত্রী) আমার সঙ্গে সংসার করতে চায় না। তারপর ও একটি চাকরি নিলো। এখন প্রতিনিয়তই আমার সঙ্গে সমস্যা হচ্ছে। উভয় পরিবারের আলোচনায় তালাকের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

দিনাজপুর পৌরসভার তালাকসংক্রান্ত সালিশি পরিষদের প্রধান, আইনজীবী ও কাজীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়- নারী নির্যাতন, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক ও মাদকের কারণে তালাকের ঘটনা ঘটছে। তালাক কমিয়ে আনার জন্য এসবের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সচেতনতার প্রয়োজন।

দিনাজপুর কাচারি রোড এলাকার স্থানীয় কাজী অফিসের কাজী মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, তালাকের মূল কারণ মাদক। পুরুষরা মাদক গ্রহণ করে কিংবা মাদকের অর্থ যোগান দিতে স্ত্রীর ওপর নির্যাতন করেন। পাশাপাশি অনেক নারীই আছেন যারা সম্পদের লোভে তালাকের সিদ্ধান্ত নেন। মূলত মধ্যবিত্ত পরিবারে এটি হয়ে থাকে। তালাক কমাতে হলে আমাদেরকে সবাইকে সচেতন হতে হবে, ধর্মের প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে।

দিনাজপুর পৌরসভার তালাক সংক্রান্ত সালিশি পরিষদের প্রধান প্যানেল মেয়র আবু তৈয়ব আলী দুলাল বলেন, প্রতি মাসে দুইবার তালাক সংক্রান্ত সালিশ পরিষদের বৈঠক বসে। সর্বশেষ গত ১ মার্চ বৈঠক বসেছিল। সেখানে ৩৬টি তালাকের বিষয় ছিল। এই ৩৬টির মধ্যে ২৭টিই ডেকেছিল মেয়ের পক্ষ থেকে। তিনি বলেন, নারীদের তালাক দেওয়ার হার পুরুষের চেয়ে বেশি। তালাকের পেছনে মাদক, মোবাইলফোনে আসক্তি, নারীদের স্বাবলম্বী হওয়া এবং বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের ঘটনা কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

দিনাজপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অ্যাডভোকেট সাথী দাস বলেন, নারীরা শিক্ষিত হচ্ছে। অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছেন। তাই খুব সহজেই পারিবারিক নির্যাতনগুলো মেনে নিচ্ছেন না। তাছাড়া পারিবারিক মনোমালিণ্য সৃষ্টি হলে আগে যেখানে সামাজিকভাবে বিষয়টি সমাধান হতো এখন সেটি হচ্ছে না। নৈতিক শিক্ষার অবক্ষয় ঘটেছে। তবে আমার মনে হয়, তালাকের বিষয়ে আইনি সংশোধন প্রয়োজন, যাতে করে তালাকের প্রবণতা কমে আসে।

দিনাজপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিউকিউটর মিন্টু কুমার পাল বলেন, নিজেদের পছন্দের বিয়েকে পরিবার মেনে নিচ্ছে না, ছেলেরা মাদকে আসক্ত হচ্ছেন, নারীদেরকে নির্যাতন করা হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা মোবাইলের মাধ্যমে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়ানোর কারণে তালাক বাড়ছে। পাশাপাশি সংসারের টানাপোড়েনের কারণেও তালাকের সংখ্যা বাড়ছে। ছেলে ও মেয়ে উভয়েই তালাকের জন্য দায়ী। তালাকের বিষয়ে আইন আরও কঠোর করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সচেতনতা। সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

ভয়েসটিভি/এমএম
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/68833
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2022 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ