Printed on Sun Sep 19 2021 10:59:32 PM

যেভাবে দু'ভাগ হয়েছিল কাশ্মীর

নিজস্ব প্রতিবেদক
বিশ্বভিডিও সংবাদ
যেভাবে দু'ভাগ হয়েছিল কাশ্মীর
যেভাবে দু'ভাগ হয়েছিল কাশ্মীর
ঐতিহাসিকভাবে কাশ্মীরকে 'কাশ্মীর উপত্যকা' নামে অভিহিত করা হয়েছে। বর্তমানে কাশ্মীর বলতে একটি তুলনামূলক বৃহৎ অঞ্চলকে বোঝায়। বর্তমান ভারত-নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য- যেটি জম্মু, কাশ্মীর উপত্যকা ও লাদাখের সমন্বয়ে গঠিত, পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীর ও গিলগিত-বালতিস্তান অঞ্চলদ্বয় এবং চীন-নিয়ন্ত্রিত আকসাই চিন ও ট্রান্স-কারাকোরাম ট্র্যাক্ট অঞ্চলদ্বয় বৃহত্তর কাশ্মীরের অন্তর্ভুক্ত।

জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের সবচেয়ে উত্তর দিকের রাজ্য। এটি উত্তরে আফগানিস্তান এবং চীন, পূর্বদিকে চীন, দক্ষিণ দিকে ভারতের হিমাচল প্রদেশ ও পাঞ্জাব দ্বারা এবং পশ্চিমে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম প্রাদেশিক সীমান্ত ও পাঞ্জাব প্রাদেশিক সীমান্ত দ্বারা বেষ্টিত। জম্মু ও কাশ্মীর ২২২,২৩৬ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে আচ্ছাদিত রয়েছে।

ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক দ্বন্দ্ব হচ্ছে ভারত–পাকিস্তান দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বের অন‍্যতম প্রধান কারণ হলো কাশ্মির সমস্যা। কাশ্মির অঞ্চলটি বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান ও চীনের মধ‍্যে বিভক্ত। ভারত পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির এবং চীন–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরকে নিজস্ব ভূমি হিসেবে দাবি করে। পাকিস্তান ভারত–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরকে নিজস্ব ভূমি হিসেবে দাবি করে। চীন ভারত–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের লাদাখ অঞ্চলটি নিজস্ব ভূমি হিসেবে দাবি করে।

ভারত–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির নিয়ে আন্তর্জাতিক এবং বাংলাদেশি গণমাধ্যমে যতটা আলোচনা হয়, পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির নিয়ে সেরকম আলোচনা প্রায় হয় না বললেই চলে। পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির বর্তমানে দুটি অংশে বিভক্ত- 'আজাদ জম্মু ও কাশ্মির' এবং 'গিলগিট–বালতিস্তান'।

ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীর অঞ্চল দু'ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল ১৯৪৭ সালে উপজাতীয় যোদ্ধাদের এক অভিযান এবং তারপরের সামরিক সংঘাতের মধ্যে দিয়ে।

১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাস। পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর উপজাতি গোষ্ঠীগুলোর যোদ্ধারা অভিযান চালান কাশ্মীর উপত্যকায়। তাদের হাতে ছিল প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র। কিন্তু তারা তেমন সুশৃঙ্খল বাহিনী ছিল না। ট্রাকে করে এই যোদ্ধাদের দল অগ্রসর হলো বারামুল্লার দিকে। কাশ্মীর উপত্যকার এক প্রান্তে একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল এই বারামুল্লা। এখানে একটি ক্যাথলিক মিশন ও হাসপাতালের ওপর আক্রমণ চালায় যোদ্ধারা।

বারামুল্লার অন্যান্য ভবনের মতোই সেন্ট জোসেফ'স কনভেন্টেও এই যোদ্ধারা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। এই উপজাতীয় যোদ্ধারা লড়াইয়ের ব্যাপারে তাদের নিজস্ব রীতিই মানে, আধুনিক যুদ্ধের কোন নিয়মকানুন তাদের জানা নেই। এই আক্রমণ হয়েছিল ব্রিটিশ শাসকদের ভারত ত্যাগের দু'মাস পরে।

বারামুল্লা শহরেও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এই আক্রমণকারীরা। ওই শহরের একটি প্রভাবশালী শিখ পরিবার ছিল বালিরা। শিখ সম্প্রদায় ছিল আক্রমণকারীদের এক বড় টার্গেট।

কাশ্মীরের জনসংখ্যার তিন-চতুর্থাংশই মুসলিম, তবে তাদের শাসক ছিলেন হরি সিং - একজন হিন্দু মহারাজা। তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না যে হিন্দু-প্রধান ভারতে যোগ দেবেন, নাকি মুসলিম-প্রধান পাকিস্তানে যোগ দেবেন। সেই রাজ্যের যুবরাজ ছিলেন তার পুত্র করণ সিং। ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্টের পর হরি সিং তাত্ত্বিকভাবে স্বাধীন রাজায় পরিণত হয়েছিলেন। কারণ তিনি ভারত বা পাকিস্তান কোনটাতেই যোগ দেন নি। তিনি দুটি দেশের সাথেই স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে চুক্তি করতে চেয়েছিলেন। সে প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই উপজাতীয়দের ওই অভিযান হয়।

উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলো অভিযান চালিয়েছিল পাকিস্তান এবং ইসলামের নাম নিয়ে। মহারাজা তখন একটি উৎসবে যোগ দিয়েছিলেন এবং এ আক্রমণের জন্য একেবারেই তৈরি ছিলেন না।

কাশ্মীরের মহারাজাকে ভারতে যোগ দেবার দিকে ঠেলে দিল এই আক্রমণ। তিনি ভারতের অংশ হবার জন্য দিল্লির সাথে একটি চুক্তি সই করলেন, এবং ভারতের সামরিক সহযোগিতা চাইলেন। তার পর তিনি একটি গাড়িবহর নিয়ে পালিয়ে জম্মু শহরে চলে গেলেন।

দশদিন অবরোধের পর ভারতীয় বাহিনী আক্রমণকারীদের শহর ছেড়ে যেতে বাধ্য করলো। পুরো কাশ্মীর উপত্যকা দখল করে নিলো ভারতীয় বাহিনী। কিন্তু কাশ্মীরের অন্য কিছু অংশ পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণেই রয়ে গেল। কয়েক মাসের মধ্যেই কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ বেধে গেল। রাজ্যটি দু-ভাগে ভাগ হয়ে গেল - যে বিভক্তি এখনো আছে।

এরপর কাশ্মীর বিভক্ত হয়ে যায় ভারত ও পাকিস্তান- নিয়ন্ত্রিত দুটি অঞ্চলে। সেই থেকে সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তান বিবাদ চলছে । কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ১৯৪৭ সালের পর থেকে একাধিকবার যুদ্ধ হয়েছে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারত-শাসিত কাশ্মীরে চলেছে তীব্র, সহিংস ও রক্তাক্ত বিদ্রোহী বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা ।

এ আক্রমণের পেছনে পাকিস্তানের ইন্ধন এবং অর্থ কাজ করেছে। পরে জনা যায় যে, এই উপজাতীয়দের মধ্যে সাদা পোশাকে পাকিস্তানি সৈন্য এবং সামরিক অফিসাররাও ছিল। কাশ্মীর দখল করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। এটা এড়িয়ে যাবার কোন উপায় নেই। কিন্তু পাকিস্তানের এ চেষ্টা তো সফল হয়নি।

১৯৪৭-পরবর্তীকালে জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ নামে পরিচিত এক আইন অনুযায়ী বিশেষ মর্যাদা, নিজেদের সংবিধান ও একটি আলাদা পতাকার অধিকার দেয়া হয়। কয়েক বছর আগে ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি সরকার ক্ষমতাসীন হবার পর ২০১৯ সালের ৫ই অগাস্ট কাশ্মীরের সেই বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিল করে। পূর্বতন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য পুরোপুরি মুছে ফেলে একে রূপান্তরিত করা হয় লাদাখ এবং জম্মু-কাশ্মীর নামে দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে। আজ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালে সৃষ্টি হওয়া কাশ্মীরের সেই বিভক্তি জোড়া লাগে নি।

ভয়েস টিভি/ এএন
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/51710
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2021 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ