Printed on Thu May 19 2022 2:52:24 AM

শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা: ২১ বছর পর অভিযুক্ত গ্রেফতার

নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয়
অভিযুক্ত গ্রেপ্তার
অভিযুক্ত গ্রেপ্তার

২০০০ সালে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি ও মুফতি হান্নানের ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট।


১ মার্চ মঙ্গলবার রাতে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত আসামির নাম মো. আজিজুল হক। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সময়ে রানা, শাহনেওয়াজ, রুমন নামেও পরিচয় দিতেন।


গ্রেফতারের সময় আজিজুল হকের কাছ থেকে জিহাদি বই, দুটি মোবাইল ফোনসেট, পেনড্রাইভ ও কম্পিউটারের হার্ডডিক্স উদ্ধার করা হয়। তার বিরুদ্ধে খিলক্ষেত থানায় সন্ত্রাস বিরোধী আইনে একটি মামলা করা হয়েছে।


২ মার্চ বুধবার দুপুরে মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সিটিটিসি প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান।


তিনি বলেন, ২০০০ সালে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার সফরসঙ্গীদের হত্যার উদ্দেশ্যে মাটির নিচে ৪০ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখা হয়। এছাড়াও হেলিপ্যাডের পাশে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখেন নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের সক্রিয় সদস্যরা।


গ্রেফতার আজিজুল হক রানা মুফতি হান্নানের সঙ্গে বোমা পুঁতে রাখার দায়িত্বে ছিলেন। ঘটনাটি প্রকাশ পেলে এবং বোমা দুইটি উদ্ধারের পর আজিজুল হক কোটালীপাড়া থেকে পালিয়ে ঢাকায় চলে আসেন।


প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, গ্রেফতার আজিজুল হক রানা ১৯৮৭ সালে গাজীপুরের শ্রীপুরে জামিয়া আনোয়ারিয়া মাদরাসায় নুরানি বিভাগে ভর্তি হন। এ সময় ওই মাদরাসার ওস্তাদ ও হরকাতুল জিহাদের সক্রিয় সদস্য মুফতি হান্নানের অনুসারী মাওলানা আমিরুল ইসলামের সংর্স্পশে আসেন। মাওলানা আমিরুল ইসলাম তাকে হরকাতুল জিহাদে যোগদানের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। মাদরাসায় মুফতি হান্নান, আব্দুর রউফ, আব্দুস সালামসহ হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজি) বিভিন্ন সিনিয়র সদস্যদের যাতায়াত ছিল। হুজি সদস্যরা ওই মাদরাসায় গোপন বৈঠক করতেন।


অতিরিক্ত কমিশনার আসাদুজ্জামান বলেন, আজিজুল হক সংগঠনে যোগদানের পর অন্য ছাত্রসহ প্রশিক্ষণ ও তালিম নেওয়ার জন্য হুজি নেতা মুফতি ইজহারের চট্টগ্রামের লালখান মাদরাসায় যান ও তালিম গ্রহণ করেন। তালিম শেষে সেখানে তিনি বোমা তৈরি, আত্মরক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।


মুফতি হান্নান সংগঠনের অপারেশনাল কার্যক্রমের জন্য সাহসী জিহাদি বিশ্বস্ত কয়েকজন লোক সংগ্রহ করার জন্য মাওলানা আমিরুল ইসলামকে দায়িত্ব দিলে তিনি আজিজুল হককে নির্বাচন করেন। আমিরুল ইসলাম তাকে একটি চিঠি লিখে দিলে সেটা নিয়ে গোপালগঞ্জ বিসিক এলাকায় সোনার বাংলা সাবান ও মোমবাতি তৈরির কারখানায় যান। মুফতি হান্নানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে মাওলানা আমিরুল ইসলামের দেওয়া চিঠিটি দেন তিনি। মুফতি হান্নান তাকে সংগঠনের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে বুঝিয়ে দেন ও আজিজুল হকের নাম পরিবর্তন করে ছদ্মনাম ‘শাহনেওয়াজ’ প্রদান করেন।


সিসিটিসি প্রধান আরও বলেন, আজিজুল হক নতুন নাম শাহনেওয়াজ পরিচয়ে প্রায় ১৫ দিন মোমবাতি প্যাকিংয়ের কাজ করেন। বিশ্বস্ততা অর্জন করলে কারখানার পেছনে একটি কক্ষে গোপন বৈঠকে উপস্থিত থাকার অনুমতি পান। কারখানায় মোমবাতি ও সাবান তৈরির আড়ালে বোমা তৈরির কাজ চলতো। বোমা তৈরির কাজে আজিজুল হকসহ মো. ইউসুফ ওরফে মোসহাব, মেহেদী হাসান ওরফে আব্দুল ওয়াদুদ, ওয়াসিম আক্তার ওরফে তারেক হোসেন, মো. মহিবুল ওরফে মফিজুর রহমান, শেখ মো. এনামুল হক, আনিসুল ইসলাম ওরফে আনিসসহ আরও অনেকেই জড়িত ছিলেন।


আজিজুল হক দীর্ঘ ২১ বছর বিভিন্ন ছদ্মবেশে নানা পেশার আড়ালে নিজেকে আত্মগোপন করে রাখেন। ২০০৭ সালে নিজের পরিচয় গোপন করে বিয়ে করেন তিনি। কয়েকবার দেশ ত্যাগের পরিকল্পনাও করেছিলেন, কিন্ত ব্যর্থ হয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার ভিন্ন ভিন্ন নামে আত্মগোপনে ছিলেন। তিনি নিজেকে লুকিয়ে রাখতে টেইলারিং, মুদি দোকানি, বই বিক্রেতা, গাড়িচালক ও সবশেষ প্রিন্টিং ও স্ট্যাম্প প্যাড বানানোর কাজ করতেন।


ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি পালিয়ে ছিলেন দেশেই। তবুও তাকে গ্রেফতারে দীর্ঘ ২১ বছর কেন লাগলো? গোয়েন্দা ব্যর্থতা রয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত কমিশনার আসাদুজ্জামান বলেন, আজিজুল হক ঘন ঘন জায়গা পরিবর্তন করতেন। ২১ বছর লাগলেও ব্যর্থতা নয় সফলতা এবং কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট সাকসেসফুল হয়েছে। এই সংগঠনের সব শীর্ষ জঙ্গিদের গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলায় আরও চারজন- মো. ইউসুফ, মো. লোকমান, শেখ মো. এনামুল ও মো. মিজানুর রহমান পালিয়ে আছেন। তাদেরকেও আমরা গ্রেফতার করতে পারবো বলে আশা করছি।


দেশে থেকেও আজিজুল হক সংগঠনের কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন। দেশের কোথাও নাশকতা কিংবা হামলার কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না আজিজুল হকের?- এমন প্রশ্নের উত্তরে সিটিটিসি প্রধান বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমন কোনো তথ্য তার কাছ থেকে আমরা পাইনি।


ধর্ষণের শিকার হয়ে চিকিৎসাধীন এক মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীকে দেখতে ২০০২ সালের ৩০ অগাস্ট সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে যান তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। সড়ক পথে ঢাকায় ফেরার সময় কলারোয়া উপজেলা বিএনপি অফিসের সামনে তার গাড়ি বহরে হামলা হয়। বোমা বিস্ফোরণ ও গাড়ি ভাঙচুরের পাশাপাশি শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গুলিও ছোড়া হয়। শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাসহ স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাংবাদিকরা সেদিন আহত হন।


ওই ঘটনায় কলারোয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মোসলেম উদ্দিন কলারোয়া থানায় মামলা করতে গেলে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তখন সাতক্ষীরার আদালতে নালিশি অভিযোগ করেন কলারোয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের কমান্ডার মোসলেম উদ্দিন। আদালত অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গণ্য করতে সংশ্লিষ্ট থানাকে নির্দেশ দেয়।


ওই মামলা খারিজ হয়ে যাওয়ার পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে ২০১৪ সালের ১৫ অক্টোবর মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করা হয়। তদন্ত শেষে তখনকার পুলিশ পরিদর্শক শফিকুর রহমান বিএনপির সাবেক সাংসদ হাবিবুল ইসলাম হাবিবসহ ৫০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন।


হত্যাচেষ্টা, বিস্ফোরক দ্রব্য ও অস্ত্র আইনের পৃথক ধারায় দেওয়া তিনটি অভিযোগপত্রের মধ্যে হত্যাচেষ্টা মামলার রায়ে ৫০ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজায় দেয় সাতক্ষীরার আদালত।


এর মধ্যে কারাগারে থাকা সাবেক সংসদ সদস্য বিএনপি নেতা হাবিবুল ইসলাম হাবিব এবং পলাতক আরিফুর রহমান ও রিপনকে কয়েকটি ধারায় দুই বছর ছয় মাস, ৫ বছর, ১ বছর, ছয় মাস এবং এক বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এক ধারার সাজা শেষ হওয়ার পর অন্য ধারার সাজা শুরু হবে। তাতে সব মিলিয়ে তাদের ১০ বছর সাজা খাটতে হবে।


ভয়েসটিভি/আরকে

যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/68226
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2022 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ