Printed on Tue Jan 25 2022 4:41:48 PM

অ্যাম্বুলেন্স এর যাত্রা শুরু যেভাবে

নিজস্ব প্রতিবেদক
ভিডিও সংবাদ
অ্যাম্বুলেন্স এর যাত্রা যেভাবে
অ্যাম্বুলেন্স এর যাত্রা যেভাবে
অসুস্থ রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে যে বাহনটি বিশ্বব্যাপী প্রচলিত তা হল অ্যাম্বুলেন্স। এই বাহনে করে মারাত্মক অসুস্থ কোনও রোগীকে খুব দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া যায়।

অ্যাম্বুলেন্স আসার আগে কোনও মানুষ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে সাধারণ যানবাহনে হাসপাতালে নেওয়ার পথে অনেক সময়ই রোগী মারা যেত।

এছাড়াও কোথাও দুর্ঘটনা বা পরিবেশ বিপর্যয় ঘটলে সেখানে মানুষদের উদ্ধারের জন্য সতর্ক সংকেত দিতে দিতে দ্রুত হাজির হয় অ্যাম্বুলেন্স।

এখন এম্বুলেন্সে রোগী হাসপাতালে আনা নেওয়া খুবই সহজ- কিন্তু একটা সময় এমনটা ছিল না। অ্যাম্বুলেন্স না থাকার ফলে অনেক রোগী হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মারা যেত।

এখন আমরা যে অ্যাম্বুলেন্স দেখছি প্রথম দিকে এটি এমন ছিল না। কালের বিবর্তনে আজ অ্যাম্বুলেন্স এমন আধুনিক হয়েছে।

অ্যাম্বুলেন্স শব্দটি ল্যাটিন শব্দ এম্বুলার থেকে এসেছে। যার অর্থ হাটা বা সামনে আগানো। দ্রুত বাহন হিসেবে এম্বুলেন্সের যাত্রা শুরু হয় ১৪৮৭ সালে স্পেনে।

তবে এম্বুলেন্সের প্রাথমিক যাত্রা শুরু হয় সেই প্রাচীন আমলেই। ইতিহাস অনুযায়ী ৯০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে প্রথম এম্বুলেন্সের যাত্রা শুরু হয়। প্রথম পর্যায়ে অ্যাম্বুলেন্স তৈরি করা হয় চট বা দড়ির চাদর দিয়ে বিছানা নির্মাণ করার মাধ্যমে।

এরপর এই চাদরকে দুই চাকার ঘোড়ার গাড়ির সাথে সংযুক্ত করে দ্রুত গতির অ্যাম্বুলেন্স তৈরির চেষ্টা করা হয়। প্রথম এই অ্যাম্বুলেন্স তৈরির কারিগর ছিলেন এঙ্গলো স্যাকসন।

১১ শতাব্দীর ক্রুসেডের সময়ে আহত সৈনিকদের এমন ঘোড়ার তৈরি এম্বুলেন্সে করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হতো।

অ্যাম্বুলেন্সকে জরুরী কোনও কাজে লাগানোর প্রথম ইতিহাসটি জানা যায় ১৪৮৭ সালে স্পেনে রানী ইসাবেলার সময়ে। এই সময়ে কোনও যুদ্ধে স্পেন বাহিনীর সৈনিকরা আক্রান্ত হলে তাদের যুদ্ধ বিরতির আগ পর্যন্ত হাসপাতালে নেয়া হতো না।

যুদ্ধ বিরতির আগ পর্যন্ত আহত সৈনিকদের এম্বুলেন্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হতো।

এই সময় এম্বুলেন্সের আকার আকৃতির প্রথম বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। আর পরিবর্তনটি সম্পাদন করেন নেপোলিয়ন বোনাপার্টের চিকিৎসক জেন ল্যারি।

তার সময়ে এম্বুলেন্সে দুই চাকার বদলে চার চাকা ব্যবহার শুরু হয়।

বোনাপার্টের যুদ্ধের সময় জেন ল্যারি তাদের সাথে থাকতেন, যখন কোনও সৈনিক আহত হতো তখন তাকে মাঠে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হতো এবং পরে একাধিক সৈনিককে এক সাথে চিকিৎসা কেন্দ্রে নেয়া হতো।

লন্ডনে কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা কেন্দ্রে নেয়ার জন্য ১৮৩২ সালে প্রথম সেখানে অ্যাম্বুলেন্স এর ব্যবহার শুরু হয়।

১৮৬১ সালে আমেরিকায় যুদ্ধ চলাকালে জোসেফ বার্নেস ও জনাথান লেটারম্যান এম্বুলেন্সের উন্নতির জন্য আরও কিছু নতুন বৈশিষ্ট্য সংযোগ করেন।

তারা অ্যাম্বুলেন্স এর ভিতরে রোগীদের চিকিৎসা প্রদানের জন্য বিশেষ নতুন কিছু যন্ত্রপাতি সংযুক্ত করেন।

তাদের তৈরি কৃত দুই চাকা বা চার চাকার গাড়িতে একসাথে দুই থেকে তিন জন রোগী একসাথে বহন করা যেত।

বাণিজ্যিকভাবে হাসপাতাল কেন্দ্রিক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের যাত্রা শুরু হয় ১৮৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওহেওতে।

১৮৬৭ সালে যুক্তরাজ্যের লন্ডন মেট্রোপলিটন বোর্ড ছয় ঘোড়া বিশিষ্ট অ্যাম্বুলেন্স এর প্রচলন করে। এই বাহনে রোগীদের আরামে শোয়ার ব্যবস্থা করা হয় এবং এই বাহন ছিল দ্রুত গতির।

নতুন এই ব্যবস্থা দেখাদেখি ১৮৮৯ সালে নিউইয়র্কের বেললোভি হাসপাতালে চার চাকা বিশিষ্ট ঘোড়ার গাড়ির অ্যাম্বুলেন্স বানিজ্যিকভাবে যাত্রা শুরু করে ।

১৯১০ সালে আয়ারল্যান্ডে রয়্যাল ডাবলিন সোসাইটির পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম সাধারণ জনগণের জন্য অ্যাম্বুলেন্স সেবার ব্যবস্থা করা হয়।

১৯ শতকের দিকে অটোমোবাইল গাড়ির প্রচলন বৃদ্ধি পেলে চার চাকার গাড়িকে অ্যাম্বুলেন্স তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়। রোগীদের আরও দ্রুত চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌঁছানোর জন্য ১৮৯৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শিকাগোর মাইকেল রিসি হাসপাতাল প্রথম অটোমোবাইল অ্যাম্বুলেন্স ক্রয় করে।

এই অ্যাম্বুলেন্সটি ক্রয় করতে হাসপাতালকে আর্থিক অনুদান দিয়েছিল শিকাগোর ৫০০ বিশিষ্ট ব্যবসায়ী।

প্রথম দিকের অটোমোবাইল অ্যাম্বুলেন্স চলতো বিদ্যুৎ শক্তিতে এবং গাড়ি গুলোর শক্তি ছিল দুই হর্স পাওয়ার। গ্যাসোলিন দ্বারা চালিত প্রথম অ্যাম্বুলেন্স এর প্রচলন হয় সর্বপ্রথম কানাডায় ১৯০৫ সালে।

১৯০৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কানিনগাম কর্তৃক একটি আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু হয়। সে সময় তাদের অটোমোবাইল গাড়িটির গতি ছিল ৩২ হর্স পাওয়ার। মূলত এই সময়ের পর থেকে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের দ্রুত আধুনিকায়ন ও বিকাশ ঘটতে থাকে।

প্রত্যেক দেশে দেশে অ্যাম্বুলেন্স এর প্রচার ও প্রচলন বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং একই সাথে বিভিন্ন দেশে অ্যাম্বুলেন্স এর উন্নয়ন ঘটতে থাকে।

১৯১৪ সালের ১ম মহাযুদ্ধ ও ১৯৪১ সালের ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় সমগ্র বিশ্ব যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে এই সময়গুলোতে অ্যাম্বুলেন্স এর চাহিদা আরও বৃদ্ধি পায়। ফলে এই সময়গুলোতে অ্যাম্বুলেন্স এর উত্তরোত্তর আরও উন্নয়ন সাধিত হতে থাকে।

১৯২৮ সালে অস্ট্রেলিয়া অ্যাম্বুলেন্স সেবায় নতুন যুগের সূচনা করে। ঘোড়ার গাড়ি ও অটোমোবাইল অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের পর রোগীকে আরও দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোর জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্স বা বিমান অ্যাম্বুলেন্স এর সূচনা করে।

এই সার্ভিসের চিন্তা প্রথম মাথায় এসেছিল অস্ট্রেলিয়ার এক মেডিকেল ছাত্র ক্লিফফোর্ড পিল এর মাথায়।

আধুনিককালে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের আরও ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। বর্তমানে সড়ক, নৌ ও আকাশ পথের দ্রুততর অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস রয়েছে। সরকারি, বেসরকারি, প্রাতিষ্ঠানিক, ব্যক্তিগতসহ বিভিন্ন ধরনের অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস এখন দেখতে পাওয়া যায়।

বর্তমানের অ্যাম্বুলেন্সগুলোতে সংযুক্ত করা হয়েছে রোগীকে এম্বুলেন্সের ভিতরে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার নানা ধরনের উপকরণ ও যন্ত্রপাতি।

অ্যাম্বুলেন্সকে বিপদের সময় দ্রুত কাছে পাওয়ার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা সরকারিভাবে হট লাইনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

যুদ্ধ ক্ষেত্রে সৈনিকদের নিরাপদে দ্রুত চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌঁছানোর জন্য বর্তমানে প্রত্যেক দেশের সামরিক বাহিনীতে সংযুক্ত করা হয়েছে বুলেট প্রুফ, বোমা প্রুফ ও শক্তিশালী অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস।

যুদ্ধ ক্ষেত্রের অ্যাম্বুলেন্স গুলোতে গাড়িতে রোগীকে দ্রুত পরিপূর্ণ চিকিৎসা সেবা প্রদানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অ্যাম্বুলেন্স সংযুক্ত সামুদ্রিক জাহাজ হাসপাতাল রয়েছে। যুদ্ধের সময় আহত সৈনিকদের এই জাহাজে চিকিৎসা প্রদান করা হয়।

দ্রুত চিকিৎসা কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য বর্তমান সময়ে যে বাহনটি সবচেয়ে বেশী উপকারী সেটি হচ্ছে অ্যাম্বুলেন্স। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসও বর্তমানে হয়েছে আধুনিক।

ফলে সমাজের উচ্চ শ্রেণী থেকে শুরু করে নিম্ন শ্রেণীর সবাই অ্যাম্বুলেন্স এর সেবা গ্রহণ করে থাকে। আর তাই অ্যাম্বুলেন্স এখন বিপদের বন্ধু।
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/60967
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2022 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ