Printed on Wed Jan 26 2022 11:49:10 PM

কাঁঠাল দিয়ে তৈরি হচ্ছে পুষ্টিকর দই ও আইসক্রিম

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রযুক্তি
কাঁঠাল দিয়ে
কাঁঠাল দিয়ে
কাঁঠালের কোয়া দিয়ে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর দই, চকলেট, আইসক্রিম এবং পনির তৈরির উপকরণ ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) বিজ্ঞানীরা। একই সঙ্গে তারা এসব খাদ্য তৈরি করে দেখিয়েছেন।

সম্প্রতি কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের সহায়তায় ‘পোস্টহারভেস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রসেসিং অ্যান্ড মার্কেটিং অব জ্যাকফ্রুট’ প্রকল্পের মাধ্যমে তারা এসব প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন। বারি’র পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রকল্পের প্রধান গবেষক ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রামের ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্স ইউনিভার্সিটির ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের চার ছাত্র এই প্রযুক্তি উদ্ভাবনে তাকে সহায়তা করেন।

ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী বলেন, ‘কাঁঠালের বহুমুখী ব্যবহারের প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ধারাবাহিকতায় এ বছর আমরা দই, পুষ্টিকর আইসক্রিম, চকলেট এবং চিজ তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছি। সবচেয়ে বড় বিষয়, এগুলো তৈরি করতে দুধের সঙ্গে শুধু কাঁঠাল প্রয়োজন। এক্ষেত্রে যদি কোনও উদ্যোক্তা কাঁঠালের কোয়া সংরক্ষণ করেন, তবে তা দিয়ে সারা বছরই এসব খাবার উৎপাদন করতে পারবেন। কাঁঠাল যেহেতু নানা পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ একটি ফল, তাই এটি দিয়ে তৈরি খাবারও বাজারের পণ্য থেকে অধিক পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ ও স্বাস্থ্যসম্মত হবে। এখানে কৃত্রিম রঙ বা ফ্লেভার ব্যবহার করা হয় না। পণ্যগুলো সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি এবং দেখতেও খুবই সুন্দর।’

তিনি জানান, এই দই তৈরিতে শতকরা ৩ থেকে ৫ ভাগ কাঁঠালের কোয়া ব্যবহার করা হয়। আইসক্রিম তৈরিতে ব্যবহার করা হয় ৫ থেকে ৮ ভাগ কোয়া। পনির তৈরিতে ৫০-৬০ ভাগ কোয়া ব্যবহার করতে হয়। ফলে ক্ষুধা নিবারণ ও পুষ্টি চাহিদা পূরণে এসব পণ্য আদর্শ পণ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে নিঃসন্দেহে। এই থেকে তৈরি খাদ্যগুলো থেকে বেশি পরিমাণ ক্যালরি পাওয়া যাবে। যে কেউ স্বল্প টাকা বিনিয়োগ করে সেগুলো তৈরি করতে পারবেন। এসব পণ্য তৈরি করতে বড় ধরনের কোনও যন্ত্রপাতির দরকার নেই। ফ্রিজ এবং ছোটখাটো কিছু হোম মেড যন্ত্রপাতি দিয়েই এসব খাবার খুব সহজেই তৈরি করা যাবে। যদি কোনও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ৮০০ টাকার কাঁচামাল ব্যবহার করেন, তাহলে তিনি খুব সহজেই ১৫০০ টাকার পণ্য তৈরি করতে পারবেন। অর্থাৎ বিনিয়োগের দ্বিগুণ লাভ করতে পারবেন। আর দেশের বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান যদি ব্যাপক পরিসরে এসব পণ্য তৈরি করে, তাহলে দেশে এসব পণ্যের ব্যাপক বাজার তৈরি হবে। পাশাপাশি বিদেশেও রফতানির সুযোগ সৃষ্টি হবে।

কাঁঠাল দিয়ে দই ও অন্যান্য পণ্য উদ্ভাবনের বিষয়ে ড. ফেরদৌস বলেন, ‘কাঁঠাল দিয়ে বিভিন্ন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পর এর কোয়া দিয়ে সারা বছর ব্যবহার করা যায়- এমন কী পণ্য উৎপন্ন করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে থাকি। প্রতি বছর অনেক পাকা কাঁঠাল নষ্ট হয়, তবে ওই কাঁঠাল থেকে কোয়া সংগ্রহ করে তা সহজেই সারা বছর সংরক্ষণ করা যায়। এই চিন্তা থেকেই দই, আইসক্রিম, চকলেট ও চিজ তৈরির পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয় এবং সফলতাও আসে। ইতোমধ্যে আমাদের এখানে চট্টগ্রামের ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্স ইউনিভার্সিটির ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের চার ছাত্র; শমিক কর প্রান্ত, আবির হাসান রিজন, অভীক চাকমা ও আ স ম রাফসান জানি তাদের অ্যাকাডেমিক কোর্স শেষ করে ট্রেনিং করতে আসেন। তাদের এই কাজে সম্পৃক্ত করি এবং সফলভাবে আমরা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে সক্ষম হই। যেহেতু পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচুর কাঁঠাল উৎপাদন হয়, তারা যদি এসব প্রযুক্তি ওই এলাকায় ছড়িয়ে দিতে পারেন, তাহলে সেখান থেকেও কাঁঠাল চাষি, উদ্যোক্তা বা স্থানীয় ব্যবসায়ীরা লাভবান হতে পারবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।’

বারি’র পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধান কৃষিবিদ হাফিজুল হক খান বলেন, ‘প্রতি বছর আমাদের দেশে বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল নষ্ট হয়। অপচয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে কাঁঠালের বহুবিধ ব্যবহারে এসব প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ফলে আমরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবো। দই, আইসক্রিমসহ যেসব পণ্য উৎপন্ন করা হয়েছে, তা পুষ্টিকর, স্বাস্থ্যসম্মত ও লাভজনক হবে। আমরা যদি এই সেক্টরে প্রশিক্ষিত লোকবল তৈরি করতে পারি, তাহলে এর ব্যাপক বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি হবে।’

এর আগে পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের বিজ্ঞানীরা কাঁঠাল দিয়ে চিপস, আচার, কাটলেট, জ্যাম, জেলিসহ প্রায় ২০টি পণ্যের উপকরণ ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছিলেন। যা তরুণ উদ্যোক্তাদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ ও সাড়া জাগিয়েছিল। এসব পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করে অনেক উদ্যোক্তাই ইতোমধ্যে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে শুরু করেছেন। শুধু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাই নয়, বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানও এসব পণ্য উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণ বা দেশের বাইরে রফতানি করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

বারি’র পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ জানায়, প্রতি বছর দেশে উৎপাদিত মোট কাঁঠালের ৪৩-৪৫ ভাগ শুধু প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। জাতীয় ফলের এই অপচয় রোধে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন হাতে নেয় ‘পোস্টহারভেস্ট ম্যানেজমেন্ট, প্রসেসিং অ্যান্ড মার্কেটিং অব জ্যাকফ্রুট’ নামে একটি গবেষণা প্রকল্প। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করেন কাঁঠালের বহুমুখী ব্যবহারের নানা উপকরণ ও প্রযুক্তি। যাতে উদ্যোক্তারা সারা বছরই বিভিন্ন পণ্য তৈরিতে কাঁঠালকে ব্যবহার করতে পারেন। কাঁঠালের অপচয় রোধ, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি, উদ্যোক্তা তৈরি, বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাঁঠাল দিয়ে তৈরি পণ্যের বড় ধরনের উৎপাদনের মাধ্যমে এটাকে শিল্পের মর্যাদা প্রদান, কর্মক্ষেত্রের ব্যবস্থা, সর্বোপরি এসব পণ্য রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখার উদ্দেশ্যে ওই প্রকল্পের মাধ্যমে একের পর এক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরীর নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা। কাঁচা ও পাকা কাঁঠালের যেসব প্রক্রিয়াজাতকরণ পণ্য তারা উদ্ভাবন করেছেন, তা দেশের বড় বড় সুপারশপে বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে।

গত বছর ঢাকার কাওলার আছমা বেগম একটি সুপার শপে তিন-চার লাখ টাকার শুধু ফ্রেশ-কাট কাঁচা কাঁঠাল বিক্রি করেন। মার্কেটে ব্যাপক চাহিদা থাকার পরও কোভিড-১৯-এর কারণে সরবরাহ করতে পারেননি। কাঁঠালের প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ধারাবাহিকতায় এবার তারা পাকা কাঁঠালের কোয়া দিয়ে মুখরোচক দই, পুষ্টিকর আইসক্রিম, চকলেট এবং চিজ তৈরির উপকরণ ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন।

সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের ধারণা, খুব স্বল্প মূলধন বিনিয়োগে উদ্যোক্তারা এসব পণ্য নিয়ে কাজ করলে তারা সহজেই খুব বেশি লাভবান হতে পারবেন এবং সারা বছর তৈরি করতে সক্ষম হবেন।
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/60340
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2022 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ