Printed on Fri Oct 15 2021 7:51:31 PM

ক্ষুদ্র ঋণের নামে ৭ দিনে দেড় কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা ‘সিরাক বাংলাদেশ’

নিজস্ব প্রতিবেদক
অর্থনীতি
ক্ষুদ্র ঋণের নামে
ক্ষুদ্র ঋণের নামে
১০ শতক জমি বন্ধক রেখে মরিচ ও সবজি চাষ করে কোনো রকম সংসার চালাচ্ছেন দিনমজুর বাচ্চু শেখ। এর মধ্যে সিরাক বাংলাদেশ নামে একটি এনজিওর ঋণের আশায় বন্ধক দেয়া জমিটিও পুনরায় অন্যের কাছে বন্ধক দেন। সেই জমি বন্ধকের টাকা এনজিও কর্মীদের কাছে জামানত রাখেন মোটা অংকের ঋণের আশায়। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন বাস্তব হওয়ার সাত দিনের মধ্যে জানতে পারেন, এনজিও কর্মীরা তাদের গ্রামের আরও ১৫ জনের ভর্তি ও জামানতের টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছেন। এভাবে উপজেলার আরো কয়েকটি গ্রাম থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন মোটা অংকের টাকা।

সিরাক বাংলাদেশ এনজিওটির অফিস ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার শৈলকুপা পৌরসভার সিটিকলেজ রোডের পাশে অবস্থিত ছিল। সংস্থাটি শৈলকুপার বিভিন্ন গ্রামের দিনমজুর ও অসচ্ছল পরিবারকে মোটা অংকের ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় দেড় কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে।

জানা গেছে, সিরাক বাংলাদেশ গত ২৫ সেপ্টেম্বর তাদের অফিসের কার্যক্রম শুরু করে। ১ অক্টোবর ঋণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে টাকা আদায় শুরু করে। কিন্তু নির্ধারিত দিনে সিরাকের গ্রাহকরা অফিসে গিয়ে দেখতে পান গেটে তালা ঝুলছে।

গ্রাহকরা বলছেন, সংস্থাটির সাজানো-গোছানো অফিস ও সাইনবোর্ড দেখে তারা টাকা জামানত রাখেন সহজ শর্তে ঋণের আশায়। কেউ কেউ পাঁচ হাজার থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত জামানত রাখেন। এখনও টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় প্রতিদিন তালাবদ্ধ অফিসের সামনে গিয়ে ভিড় করছেন গ্রাহকরা।

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, শৈলকুপা পৌরসভার সিটিকলেজ রোডের গ্রিস প্রবাসী আকবর হোসেনের বাড়ি ভাড়া নেয় এনজিও নামধারী অই প্রতারক দল। কবিরপুর এলাকার সিটি কলেজ সড়কে একটি একতলা বাড়ির মূল ফটকের সামনে সাইনবোর্ড টাঙানো। তবে ফটকটি তালাবদ্ধ। সাইনবোর্ডটিতে লেখা আছে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত সিরাক বাংলাদেশ, ক্ষুদ্র ঋণ দান ও কুটির শিল্প প্রকল্প’। অফিসের সামনে দুই একজন গ্রাহক এখনো জামানত টাকার ঋণ পাওয়ার আশায় ঘুরছেন।

স্থানীয়রা জানায়, মাসিক চার হাজার টাকায় বাড়িটি ভাড়া নেয় এনজিওটি। এক বছরের টাকা অগ্রিম দেওয়ার কথা ছিল তাদের। গত মাসের ২৫ সেপ্টেম্বর বাসার গেটে সিরাক বাংলাদেশ নামে একটি সাইনবোর্ড লাগায় তারা। ১ অক্টোবর তাদের ঋণ দেওয়ার কার্যক্রম উদ্বোধন করার কথা ছিল।

জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে তারা কয়েকশ মানুষের কাছ থেকে ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়ার নাম করে ৫-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছে। এ ঘটনায় শৈলকুপা থানায় এনজিও কর্মী নাজমুলকে প্রধান আসামি করে উপজেলার হড়রা গ্রামের প্রতারণার শিকার রুহুল আমিন একটি মামলা দায়ের করেছেন।

সিটি কলেজ পাড়ার বাসিন্দা জাহানারা খাতুন বলেন, ‘মেয়ের জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণের আশায় ১৫ হাজার ২৫০ টাকা দিয়েছি ওই সংস্থার নাজমুল নামে এক কর্মীর কাছে। কে জানতো আমরা প্রতারণার শিকার হব।’ টাকা হারিয়ে এখন তিনি বাকরুদ্ধ।

উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের হাসি খাতুন জানান, একই গ্রামের লাভলী খাতুন প্রথমে তাকে সিরাক বাংলাদেশের কথা বলে। এরপর কেন্দ্রে গেলে এনজিও কর্মী তাকে ২৫০ টাকা ফি দিয়ে ভর্তি হতে বলে। তখন তিনি টাকা দিয়ে ভর্তি হন। এক দিন পরে তারা বলে, আপনি কত টাকা নিবেন ৫০ হাজার না ১ লাখ। তখন আমি বলি আপনারা আগে অন্য মানুষদের ঋণ দেন, তারপর আমরা নেব। পরের দিন সকালে আমাকে বলে, আপনার ছেলে আমাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে। এ জন্য আপনাদের সদস্যই বাতিল করা হয়েছে। তখন আমাদের ভর্তির টাকা ফেরত দিয়ে দেন।

আরও পড়ুন : চুয়াডাঙ্গায় গ্রাহকের কোটি টাকা নিয়ে এনজিও উধাও

শ্রীমতি অঞ্জনা রাণী জানায়, তিনি প্রতিবেশীর কথা শুনে ওই এনজিওতে ২৫০ টাকা দিয়ে ভর্তি হন। এরপর অনেক কষ্টে ধার করে ৫০ হাজার টাকা ঋণের জন্য ৫ হাজার টাকা সঞ্চয় দেন। অক্টোবরের এক তারিখে তাদের ঋণ বিতরণের কথা ছিল। ঋণ নিতে গিয়ে দেখি অফিসে তালা ঝুলছে। টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেছে প্রতারক চক্রটি।

মোছা. রাবেয়া খাতুন জানায়, এনজিও কর্মীরা তাদের ৫০ থেকে ১ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখায়। এই প্রলোভনে পড়ে তিনিসহ তার সমিতির পাঁচজন ১০ হাজার টাকা করে জমা দেন। কেউ কেউ পাঁচ হাজার টাকা করে জমা দেন। এনজিও কর্মীরা তাদের টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেছে।

এরপর ওই এনজিও কর্মীরা বলেন, তাদের থেকে ঋণ নিতে হলে ১ লাখে ১০ হাজার টাকা করে জমা দিতে হবে। এরপর আমাদের বন্ধক রাখা জমিটি আবারও অন্যের কাছে বন্ধক দিয়ে ১০ হাজার টাকা জমা দেই। আমার দেখাদেখি অন্যরাও সঞ্চয়ের টাকা জমা দেন। এরপর ১ অক্টোবর তারা ঋণ বিতরণের কথা বলেন। আমরা নির্ধারিত দিনে টাকা নিতে গিয়ে দেখি অফিসে তালা ঝুলছে।

কবিরপুর এলাকার মনিরুল ইসলাম জানায়, মাত্র সাত দিন এখানে ছিল। এ সংস্থাটির কর্মকর্তারা এই এলাকায় বেশি পরিচিত নয়।  তারা বেশির ভাগ সময় অফিসের মধ্যেই থাকতেন। বাইরে বের হতেনে শুধু অর্থ সংগ্রহের জন্য। নামজুল হোসেন নিজেকে সংস্থার প্রধান বলে পরিচয় দেন।

তিনি আরও জানান, প্রতিদিন দলে দলে গ্রাহকরা আসছেন। সংস্থাটি প্রতারণা করায় তারা ক্ষোভের কথা বলছেন। এখন পর্যন্ত যতটুকু জানা গেছে, প্রতারক চক্রের কর্মকর্তারা সহস্রাধিক সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তাদের ব্যবহৃত মুঠোফোনগুলো এখনো বন্ধ।

সিরাক বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এস এম সৈকত মুঠোফোনে জানিয়েছেন, ঝিনাইদহ জেলাতে আমাদের সংস্থার কোনো শাখা নেই। এ ছাড়া সিরাক ঋণদান কর্মসূচি বাস্তবায়নও করে না। আমাদের সংস্থার নাম ব্যবহার করে একটি চক্র প্রতারণা করছে বলে ক্ষতিগ্রস্তদের মাধ্যমে আমি জানতে পেরেছি।

যদি কোনো এনজিও বা সংস্থার ঝিনাইদহে কাজকর্ম পরিচালনা করতে হয় তাহলে অবশ্যই তাদের ঝিনাইদহ জেলা সমাজসেবা কার্য্যালয় থেকে অনুমতি নিয়ে কাজ করতে হবে।

ভয়েস টিভি/এমএম
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/55637
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2021 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ