Printed on Wed May 25 2022 4:18:59 AM

জোড়া খুনের নেপথ্যে লোভ: কাজের লোককে ‘অতিরিক্ত বিশ্বাস’ নয়

নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয়
বৃদ্ধা আফরোজা বেগম থাকতেন ধানমন্ডি ২৮ নম্বর রোডের ২১ নম্বর বাসার ই-৫ ফ্ল্যাটে। তার দেখভাল করার জন্য রাখা হয়েছিল গৃহপরিচারিকা দিতিকে। ওই বাসায় দীর্ঘদিনের সম্পর্কে বিশ্বস্ত হয়ে ওঠা মো. বাচ্চু মিয়া (৩৪) টানা ১০ বছর ধরে ভবনটির দেখভাল করতেন। নতুন গৃহকর্মী সুরভী আক্তার নাহিদাকে নিয়ে সেই বাচ্চু মিয়াই আফরোজা বেগমের বাসা থেকে স্বর্ণালংকার লুটের পরিকল্পনা করেন!

২০১৯ সালের ১ নভেম্বর লোবেলিয়া অ্যাপার্টমেন্টের ওই বাসায় স্বর্ণালংকার লুটের ঘটনায় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে ছুরিকাঘাত করা হয় গৃহকর্ত্রী আফরোজা বেগমকে। ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু হয়। হত্যার ওই দৃশ্য দেখে ফেলায় খুন করা হয় কাজের মেয়ে দিতিকেও।

ওই ঘটনায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি না দিলেও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) বলছে, ভবনের তত্ত্বাবধায়ক বাচ্চু মিয়ার ওপর অঘাত বিশ্বাস এবং তার লোভের কারণে খুন হতে হয়েছে দুটো তাজা প্রাণকে।

অন্যদিকে, বাচ্চু মিয়ার প্রলোভনে পড়ে খুনের অংশীদার হন নতুন কাজের মেয়ে সুরভী। সুরভী ইতোমধ্যে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দিয়েছেন। খুব শিগগিরই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করবে পিবিআই।

বুধবার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত পিবিআই সদর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পিবিআই অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিটের (উত্তর) পুলিশ সুপার আহসান হাবীব পলাশ। তিনি বলেন, খুনের ঘটনায় ৩ নভেম্বর মৃত আফরোজা বেগমের মেয়ে অ্যাডভোকেট দিলরুবা সুলতানা রুবা (৪২) ধানমন্ডি থানায় মামলা করেন। ওই ঘটনায় ধানমন্ডি থানা ও ডিবি পুলিশ তদন্ত শুরু করে। ২৬ দিন তদন্ত করে মূল দুই আসামি ভবনের তত্ত্বাবধায়ক বাচ্চু মিয়া ও গৃহকর্মী সুরভীসহ সন্দেহভাজন পাঁচজনকে আটক করে। সুরভী দোষ স্বীকার করে বিজ্ঞ আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দেন।



তবে মামলার বাদীর নারাজি ও পুলিশ সদরদপ্তরের নির্দেশে পিবিআই ওই বছরের ১ ডিসেম্বর তদন্ত শুরু করে। পিবিআই পুনরায় গ্রেফতার সুরভী ও বাচ্চু মিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেয়। রিমান্ডে এসে সুরভীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তার আগারগাঁও ভাড়া বাসার মাটি খুঁড়ে স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়। মোবাইল বিক্রির কথাও স্বীকার করেন সুরভী। দোষ স্বীকার করে পুনরায় বিজ্ঞ আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন তিনি।

হত্যার ঘটনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আহসান হাবীব পলাশ বলেন, বাচ্চু মিয়া দীর্ঘ ১০ বছর ধরে ভুক্তভোগী আফরোজা বেগমের বাসায় বিশ্বস্ততার সঙ্গে কাজ করে আসছিলেন। তবে বাচ্চু মিয়ার মধ্যে বিলাসী জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা ছিল। সেই আকাঙ্ক্ষা থেকে অর্থসম্পত্তির প্রতি লোভ জন্মায় তার।

ওই সময় আরও একজন গৃহকর্মীকে খুঁজছিলেন মামলার বাদী দিলরুবা। সুযোগটি কাজে লাগান বাচ্চু মিয়া। সুরভী আক্তার নাহিদা কাজের খোঁজে ধানমন্ডি আসেন। পথে বাচ্চু মিয়ার সঙ্গে পরিচয় হয়। ফোন নম্বর আদান-প্রদান হয়। পরে বাচ্চু মিয়া সুরভীকে সঙ্গে নিয়ে স্বর্ণালংকার লুটের পরিকল্পনা করেন।

বাচ্চু মিয়া সুরভীকে লোভনীয় প্রলোভন দেখান এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী তাকে দিয়ে আগারগাঁও মার্কেট থেকে ছুরি কেনেন। সুরভীকে নতুন কাজের লোক সাজিয়ে ২০১৯ সালের ১ নভেম্বর ওই বাসায় যান। কাজের বিষয়ে গৃহকর্ত্রী আফরোজা বেগমের সঙ্গে তারা কথা বলেন। সুরভী ওই বাসায় প্রায় দুই ঘণ্টা অবস্থান করে কিছু কাজও করেন।

ওই দিন বিকেল ৪টার দিকে বাচ্চু মিয়া বাসায় ঢুকে আলমারির চাবি চান। এ সময় সুরভীও ছুরি নিয়ে গৃহকর্ত্রী আফরোজা বেগমের শয়ন কক্ষে যান। চাবি দিতে না চাইলে বাচ্চু ও সুরভী ছুরি দিয়ে আফরোজার গলা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে রক্তাক্ত জখম করেন। এরপর তারা চাবি নিয়ে আলমারি খুলে একটি স্বর্ণের চেইন, দুটি স্বর্ণের চুড়ি, একটি মোবাইল সেট হাতিয়ে নেয়। অপর কাজের মেয়ে দিতি পাশের কক্ষ থেকে দেখে ফেলায় তাকেও সুরভী ছুরি দিয়ে একাধিক আঘাত করে গুরুতর জখম করে পালিয়ে যান। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে দুজনেরই মৃত্যু হয়।

পরে পাশের ফ্ল্যাটে বসবাসকারী গৃহকর্ত্রী আফরোজা বেগমের মেয়ে ও মামলার বাদী দিলরুবা সুলতানা রুবা কাজের লোক পাঠিয়ে জানতে পারেন কাজের মেয়েসহ তার মাকে খুন করা হয়েছে।

শুধু লোভ থেকে খুন নাকি অন্য কোনো কারণ ছিল— জানতে চাইলে এসপি পলাশ বলেন, গৃহকর্ত্রীর বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে লোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটান বাচ্চু মিয়া। স্বর্ণালংকার লুটে বাধা পাওয়ায় দুজনকেই খুন করেন তারা।

বাচ্চু মিয়া তো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি। শুধু সুরভীর কথায় কীভাবে বাচ্চু মিয়াকে পিবিআই দোষী মনে করছে— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভবনের একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরা, বাচ্চু ও সুরভীর মধ্যে সাক্ষাতের ভিডিও এবং তাদের মধ্যে মোবাইলফোনের কথোপকথন তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়েছে যে বাচ্চু মিয়াই পরিকল্পনাকারী। ওই ঘটনায় পিবিআই দুজনের বিরুদ্ধে শিগগিরই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে এসপি পলাশ বলেন, কাজের লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু বিধিবিধান আছে। নিয়োগের আগে গৃহকর্মীর নাম ও ঠিকানা যাচাই করা, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি রাখা, অপরিচিত কাউকে বাসায় কাজ না দেওয়া, দীর্ঘদিনের কাজের লোককে অতিরিক্ত বিশ্বাস না করা, মোবাইল নম্বর যাচাই ও ছবি রাখা প্রভৃতি বিষয় দেখতে হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে বিষয়গুলো মানা হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত নিহতের মেয়ে ও বাদী দিলরুবা সুলতানা বলেন, আস্থার জায়গা থেকে পিবিআইকে তদন্তের জন্য আমি ডিবির উপরে নারাজি দিই। পিবিআই সেই আস্থার প্রতিদান দিয়েছে। তারা লুট করা স্বর্ণালংকার উদ্ধার করেছে। সুরভী পুনরায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সবকিছু স্পষ্ট করেছে। যত দ্রুত সম্ভব জড়িত দুজনের ফাঁসির দাবি করছি।

ভয়েসটিভি/এমএম
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/66284
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2022 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ