Printed on Sat May 28 2022 8:09:16 AM

মালি-ঝাড়ুদারের পোশাকের টাকা আত্মসাৎ

নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয়
টাকা আত্মসাত
টাকা আত্মসাত
চারশ’ মালি ও ঝাড়ুদারের পোশাকের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে গণপূর্ত বিভাগের অধীন আরবরিকালচারের প্রধান বৃক্ষপালনবিদের বিরুদ্ধে। কর্তৃপক্ষ বলছেন তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। অন্যদিকে মালিরা অভিযোগ করে বলেন, পোশাক চাইতে গেলে কর্তৃপক্ষ বলে ‘পোশাক দিবো না, যা করতে পারো করো।’

জাতীয় সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর দফতর, সচিবালয়সহ সরকারি বিভিন্ন বাড়ির সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য গাছ রোপণ ও পরিচর্যার দায়িত্বে থাকেন এসব মালি ও ঝাড়ুদাররা।

নিয়ম অনুযায়ী, তারা প্রতি শীত ও গরমের সময়ে কাজ করার জন্য নির্দিষ্ট পোশাক বরাদ্দ পাবেন। কিন্তু পোশাক চাইতে গেলে নিগ্রহের শিকার হন তারা, বন্ধ হয়ে যায় বেতন। এভাবে প্রায় ৯ বছর ধরে তারা কোনো পোশাক পাচ্ছেন না। নিজেদের সাধারণ প্যান্ট-শার্ট পরেই বাগানে কাজ করেন।

পোশাক আত্মসাতের ঘটনায় প্রধান বৃক্ষপালনবিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত হলেও এ প্রতিবেদন আলোরমুখ দেখেনি। উল্টো যারা তদন্ত করেছেন তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে। বিভিন্নভাবে হয়রানিও করা হয়।

অভিযোগের বিষয়ে গণপূর্তের প্রধান বৃক্ষপালনবিদ (আরবরিকালচার) কুদরত-ই-খুদা বলেন, ‘পোশাকের বিষয়ে কোর্টে মামলা চলছে, তাই আমি এসব বিষয়ে কথা বলবো না। তবে একটি চক্র আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। এর বেশি আর কিছু বলা যাবে না।’

গণপূর্তের নিয়োগকৃত মালির সংখ্যা চারশ’র কাছাকাছি। কিছু মালি অবসরে গেলেও এই সংখ্যা এখন সাড়ে তিনশ’র কম নয়। এছাড়াও দৈনিক মজুরির ভিত্তিতেও কিছু মালি কাজ করেন। এদের মধ্যে নারী ও পুরুষ উভয় শ্রেণির মালি রয়েছেন।

গণপূর্ত বিভাগের আরবরিকালচার শাখার চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী বা মালিরা জাতীয় সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর দফতরসহ রাজধানীর সরকারি বড় বড় উদ্যান, পার্ক, সচিবালয়, সরকারি অফিস, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ ভিআইপিদের বাড়ি ও রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনগুলোর সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করেন। নির্ধারিত পোশাক পরে তাদের ওইসব এলাকায় বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা ও পরিচর্যাসহ সৌন্দর্যবর্ধনের দায়িত্ব পালন করার কথা।

মালিদের পোশাকের জন্য প্রতি বছর দশ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। বরাদ্দ থেকে কখনো মালিদের টাকা দেওয়া হয়, আবার কখনও পোশাক তৈরি করে দেওয়া হয়। কিন্তু ২০১৩ সালের পর থেকে ওই কর্মচারীরা কোনো পোশাক পাচ্ছেন না। গত ৯ বছর ধরে মালিদের জন্য বরাদ্দ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে। প্রথম অভিযোগ উঠে ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে। ভুয়া বিল তৈরি করে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া যায় প্রধান বৃক্ষপালনবিদ কুদরত-ই-খুদার বিরুদ্ধে। পরে তার নামে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা হয়।

দুদকের উপসহকারী পরিচালক সিলভিয়া ফেরদৌসকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। দুদক দু’জন কর্মচারীকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তলব করে। তারা পোশাক না পাওয়ার স্বীকারোক্তি দিয়ে বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরে তাদের কোনো পোশাক দেওয়া হচ্ছে না। ফলে পোশাক ছাড়াই তাদের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এরপরই ক্ষুব্ধ হন প্রধান বৃক্ষপালনবিদ কুদরত-ই-খুদা। ঢাকার বাইরে বদলি করা হয় কার্যভিত্তিক মেকানিক মো. সোলেমান ও নজরুল ইসলামকে।

সিলভিয়া তদন্ত শুরুর কিছুদিন পর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের জন্য দুদকে আবেদন করেন কুদরত-ই-খুদা। তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করে সহকারী পরিচালক মো. শফি উল্লাহকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করে দুদক। এরপর থেকে মামলার তদন্তে গতি নেই।

মো. শফি উল্লাহ বর্তমানে দুদকের রাঙ্গামাটি জেলা সমন্বিত কর্যালয়ের উপ-পরিচালক। তিনি বলেন, এ ঘটনায় আমি তদন্ত কর্মকর্তা ছিলাম। অনেক আগের ঘটনা, এখন আমার ঠিক মনে নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণপূর্তের একজন প্রকৌশলী জানান, অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে ওই কর্মকর্তা বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এজন্য তদন্তের গতি শ্লথ হয়ে যায়।

পোশাক না পাওয়ার বিষয়টি জানিয়ে মালি ও ঝাড়ুদাররা মিলে একটি আবেদনে স্বাক্ষর করে গণপূর্তের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানায়। একাধিক মালির সঙ্গে কথা বলে পোশাক না পাওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মালি বলেন, ‘আগে বছরে দুবার পোশাক পেতাম। শীতের সময় এক ধরণের পোশাক, গরমের সময় আরেক ধরণের। পোশাকের মধ্যে রয়েছে—শার্ট, প্যান্ট, বুট, ছাতা, লাইট, আর ঝাড়ুদার নারীদের জন্য শাড়ি, ব্লাউজও বরাদ্দ ছিল। এখন কেউ কিছু পায় না। কেউ পোশাক চাইতে গেলে কুদরাত-ই-খুদা বলেন, ‘পোশাক দিবো না, যা করতে পারো করো।’

মালিদের পোশাকের টাকা আত্মসাতের বিষয়টি গণপূর্ত অধিদফতরের কর্মকর্তারা বিভিন্ন অভিযোগের মাধ্যমে জানতে পারেন। এরপর প্রধান বৃক্ষপালনবিদের বিরুদ্ধে তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয় গণপূর্ত। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে গণপূর্ত বিভাগ বিষয়টির বিভাগীয় তদন্ত শুরু করতে তিনজন প্রকৌশলীকে নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কায়কোবাদকে। নির্বাহী প্রকৌশলী হাসনাত সাবরিনাকে সদস্য সচিব এবং উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী নাহিদ আফরোজকে সদস্য করা হয়।

তদন্ত কমিটির প্রধান ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কায়কোবাদ বলেন, ‘মালি ও ঝাড়ুদারদের পোশাক না দিয়ে তাদের নামের বিপরীতে ভুয়া বিলের মাধ্যমে অর্থআত্মসাৎ করার অভিযোগ ছিল। আমরা তদন্ত শেষ করে রিপোর্ট জমা দিয়েছি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিবছরই জাতীয় সংসদ ভবন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, সচিবালয়, স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীদের বাসভবনসহ সরকারি দফতরে প্রায় ১২ কোটি টাকার সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য গাছ লাগানোর বরাদ্দ থাকে। এছাড়াও গোবর ও মাটি ক্রয়ের জন্যও আলাদা বরাদ্দ থাকে। অভিযোগ রয়েছে—পুরনো মাটি ও গোবর বছরের পর বছর ব্যবহার করা হয়। নতুন করে কেনা হয় না। কিন্তু নতুন করে বিল বানানো হয়।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কুদরত-ই-খুদা বলেন, ‘আমার প্রতিপক্ষ একটি গ্রুপ প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। বিষয়টি নিয়ে মামলা চলছে, আমি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে পারবো না, মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।’

ভয়েসটিভি/এমএম
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/70435
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2022 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ