Printed on Fri May 20 2022 7:36:15 AM

পুরান ঢাকার বাকরখানির সঙ্গে হবিগঞ্জের কী সম্পর্ক?

নিজস্ব প্রতিবেদক
সারাদেশ
ঢাকার বাকরখানি
ঢাকার বাকরখানি
প্রায় তিনশ’ বছরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বাকরখানি। এর সঙ্গে শত বছর ধরে জড়িয়ে আছে সিলেটের হবিগঞ্জ জেলাও। ধারণা করা হয়, স্বাধীনতার আগে থেকেই বংশ পরম্পরায় হবিগঞ্জের মানুষ বাকরখানি তৈরিতে জড়িত ছিলেন। এর মধ্যে হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার লোকজন নিয়মিতই বানাতেন সুস্বাদু খাবারটি।

পুরান ঢাকায় যত বাকরখানি ব্যবসায়ী আছেন তাদের অধিকাংশের গ্রামের বাড়িও হবিগঞ্জে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বেশিরভাগ বাকরখানি ব্যবসায়ী এ কাজে জড়িয়েছেন পৈত্রিক সূত্রে।

শুধু পুরান ঢাকাতেই আছে প্রায় একশ’ বাকরখানির দোকান। তাদের মধ্যে ৮৫ শতাংশেরই আদিনিবাস হবিগঞ্জ।

২৫ বছর এই ব্যবসা করছেন হিরু মিয়া (৫২)। তিনি বলেন, তার চাচা আমুল হোসেনের সূত্র ধরেই এই ব্যবসায় এসেছেন। এর আগে তার বাবা মকবুল হোসেন এবং দাদা সওদাগর মিয়া ভারতের কলকাতায় বাকরখানির ব্যবসা করতেন। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে এসে মৃত্যুর আগপর্যন্ত বাকরখানি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

শাহাদাত হোসেন (৪৫) নামের আরেক ব্যবসায়ী বললেন, এখন ঢাকায় বাকরখানি টিকে আছে হবিগঞ্জের মানুষের জন্যই। এর চাহিদা অনেক। তৈরিতে কষ্টও আছে। আমার বাবা এখানে বাকরখানির দোকানে কাজ করতেন। ধীরে ধীরে তিনি নিজেই দোকান দেন। সেই দোকান এখন আমি সামলাচ্ছি।

হবিগঞ্জ থেকে আসা আরেক বাকরখানি ব্যবসায়ী আবদুল হাকিম (৫৫) জানান, মোটামুটি ভালো বেচাকেনা হয় বলে পৈত্রিক ব্যবসা ধরে রেখেছি। প্রতিদিন অনায়াসে দেড় থেকে দুই হাজার পিস বিক্রি হয়। দিনে প্রায় ১০ হাজার টাকার বেচা-কেনা হয়। প্রত্যেকটি দোকানেই ৩/৪ জন কারিগর কাজ করে। যাদের মজুরি ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।

বাকরখানি দোকান মালিকদের কোনও সমিতি বা সংগঠন নেই। তবে দাম বাড়ানো বা কমানোর জন্য তারা নিজেরা আলোচনা করে থাকে। তবে দামের পার্থক্য খুব একটা দেখা যায় না বললেই চলে।

সাধারণ পাঁচ প্রকারের বাকরখানি পাওয়া যায়। ঝাল, মিষ্টি, নোনতা, পনির এবং ঘি-এর স্বাদে। ঝাল, মিষ্টি ও নোনতা সবসময়ই দোকানে দেখা যায়। পনির ও ঘি-এর বাকরখানি অর্ডার দিয়ে বানাতে হয়।

এটি সাধারণত পিস বা কেজি দরে বিক্রি হয়। প্রতি পিসের দাম পাঁচ টাকা। কেজি ১৪০/১৫০ টাকা। পনিরের বাকরখানির দাম ২৫০ টাকার মতো এবং ঘি দিয়ে তৈরি বাকরখানি ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়।

পুরান ঢাকার সূত্রাপুর, নারিন্দা, সিদ্দিক বাজার, আলু বাজার, চানখাঁরপুল, আগা নবাব দেউড়ি, কোতোয়ালি, চকবাজার, হাজারীবাগ, ওয়ারী, নয়া বাজার, রায়সাহেব বাজার, কলতা বাজার, দয়াগঞ্জ, বংশাল, নাজিম উদ্দিন রোড, লালবাগ এলাকায় বাকরখানির দোকান বেশি দেখা যায়।

বাকেরখানির সঙ্গে একটি প্রেমের গল্প

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, বাকরখানি তৈরির পেছনে রয়েছে এক ব্যর্থ প্রেমকাহিনী। আগা বাকের নামের তুর্কিস্তানের এক ভাগ্যবিড়ম্বিত বালক ক্রীতদাস হয়ে এসেছিল এ দেশে। বাংলার সুবেদার নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ তাকে কিনে নিয়েছিলেন। বাকেরের বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ হয়ে নবাব তাকে লেখাপড়া ও সামরিকবিদ্যায় সুশিক্ষিত করে তোলেন। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি বাকলা চন্দ্রদ্বীপের শাসনকর্তা ছিলেন। তার নামানুসারে বাকেরগঞ্জ (পরে বরিশাল) জেলার উৎপত্তি।

আগা বাকেরের প্রেমকাহিনি নিয়ে অনেক গল্প প্রচলিত। বাকের ভালবেসেছিলেন নর্তকী খনি বেগমকে। তার প্রেমের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন উজির জাহান্দার খাঁর ছেলে কোতোয়াল জয়নুল খাঁ।

সুবেদার নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ এই দ্বন্দ্বের সূত্র ধরে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে বাকেরকে বাঘের খাঁচায় নিক্ষেপ করেছিলেন। শক্তিধর কৌশলী যোদ্ধা বাকের ওই বাঘকে হত্যা করে খাঁচা থেকে বীরদর্পে বেরিয়ে এসেছিলেন। এদিকে খনি বেগমকে নিয়ে দুর্গম এক দ্বীপে পালিয়ে গিয়েছিলেন জয়নুল খাঁ। আগা বাকের প্রেমিকাকে উদ্ধারে রণসাজে চন্দ্রদ্বীপে উপস্থিত হলে জয়নুল খাঁ খনি বেগমকে হত্যা করে নিজেও আত্মঘাতী হন। খনি বেগমকে না পেলেও প্রেমের স্মৃতি ধরে রাখতে বাকের নতুন ধরনের শুকনো রুটি তৈরি করে নাম দেন বাকের-খনি। ক্রমে যা ‘বাকরখানি’ হয়ে গেছে।

ভয়েসটিভি/এমএম
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/69414
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2022 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ