Printed on Tue Sep 28 2021 6:47:27 PM

প্রকৃতি প্রেমী বিশনয়ী সম্প্রদায়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বিশ্বভিডিও সংবাদ
প্রকৃতি প্রেমী
প্রকৃতি প্রেমী
১৭৩০ সালের সেপ্টেম্বর মাসের কোনো এক মঙ্গলবার। মারওয়ার রাজ্যের মন্ত্রী গিরিধার ভাণ্ডারী খেজরলি গ্রামে এসে ঘোষণা দিলেন, রাজপ্রাসাদের নির্মাণকাজের জন্য কাটা হবে গাছ। গ্রামটি ছিলো বিশনয়ী সম্প্রদায়ের, যাদের কাছে প্রাণ-প্রকৃতি ঈশ্বরের মতোই পবিত্র।

মন্ত্রীর ঘোষণার বিরুদ্ধে সেদিন প্রতিবাদ করেছিলেন গ্রামের অমৃতা দেবী বিশনয়ী। প্রথমে তাকে ঘুষ দিয়ে মানানোর চেষ্টা করা হয়েছিলো। অমৃতা আপোস করেননি তাতেও। উপায় না পেয়ে সৈন্য-সামন্ত দিয়ে বলপূর্বক গাছ কাটারই সিদ্ধান্ত নিলেন মন্ত্রী।

সেদিন গাছকে বুকে জড়িয়ে অমৃতা দেবী দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, "সার সন্ঠে রুখ জায়ে, তো ভি সাস্তো জান।" যার ভাবার্থ, একটি মাথার বিনিময়ে হলেও যদি একটি গাছ বাঁচানো যায়, তবে তা-ই সই। ফলস্বরূপ সৈন্যের কুড়োলকে গাছের স্পর্শ পাবার আগে পার করতে হলো অমৃতার গর্দান! মায়ের দেখাদেখি একইভাবে প্রাণ দেয় তিন কন্যা। খবর শুনে আশপাশের ৮৩টি গ্রাম থেকে ছুটে আসে অর্ধ-সহস্র বিশনয়ী।

তারা ঠিক করলো, প্রতিটি গাছের জন্য তারা একজন করে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করবে। অমৃতা দেবীর দেখানো পথে বিশনয়ী সম্প্রদায়ের বয়ঃজ্যেষ্ঠরা তখন একটি করে গাছ জড়িয়ে ধরেন, আর একটি একটি করে ছিন্ন শির লুটিয়ে পড়তে থাকে থর মরুর বুকে।

রাজা অভয় সিং এ ঘটনা জানতে পেয়ে মর্মাহত হন। মন্ত্রী তখন রাজাকে বোঝান, “এসব বিশনয়ীদের আদিখ্যেতা। বেছে বেছে তারা কেবল বুড়োদের মরতে পাঠিয়েছে, যারা ওদের আর কোনো কাজে আসত না!” বিশনয়ী সম্প্রদায়ের তরুণ পুরুষ, নারী ও শিশুরা এসব দেখে উল্টো সিদ্ধান্ত নিলো, বড়দের এই আত্মত্যাগের আদর্শকে তারাও নিজেদের পাথেয় করবে।

ওদিকে রাজা মারওয়াররাজ অভয় সিংও ঠিক করলেন, যত যা-ই হোক, অন্তত বিশনয়ীদের গ্রাম থেকে কোনোদিন কোনো গাছ কাটা হবে না। ইতিহাসের মহাফেজখানায় ‘বিশনয়ী’ লেখা নথিটিতে খেজরলি গ্রামের অধ্যায়টির পাতায় বিস্মৃতির ধুলো জমলেও একটি দৃষ্টান্ত কিন্তু এখনও টাটকা।

১৯৯৮ সালে ‘হাম তুম সাথ সাথ হ্যায়’ সিনেমার শ্যুটিং করতে রাজস্থান রাজ্যের যোধপুরের কনকানি গ্রামে গিয়েছিলেন সালমান খান, সাইফ আলী খান, টাবু, সোনালি বেন্দ্রের মতো বলিউড তারকারা। শিকারি সালমানের গুলিতে সেদিন প্রাণ হারিয়েছিলো একাধিক বিরল কৃষ্ণসার ও চিঙ্কারা হরিণ।

সেই ঘটনার জেরে আজও আইনীভাবে নাজেহাল হচ্ছেন সালমান খান। বলিউড তারকাদের বন্দুকবিলাসের বিরুদ্ধে সেদিন মামলা ঠুকেছিলো কনকানি গ্রামের বিশনয়ী সম্প্রদায়ের লোকেরাই।

ইতিহাস চর্চায় বার বার একটি প্রশ্নই সামনে আসছে- কারা এই বিশনয়ী? পশ্চিম রাজস্থানের বিস্তীর্ণ থরের বুকে বহু বছর ধরে বাস করছেন বিশনয়ীরা। ধর্মীয় দিক থেকে তারা সনাতন ধর্মের বৈষ্ণব ধারাভূক্ত হলেও এদের আছে আলাদা দর্শন। তারা বিশ্বাস করে, প্রতিটি জীবন্ত জিনিসের বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। প্রাণ- প্রকৃতিকে রক্ষা করাই তাদের কাছে পরম ধর্ম।

বিশনয়ী সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক গুরু জম্ভেশ্বর। সাড়ে পাঁচশ বছর আগে তার জন্ম হয়েছিলো ক্ষত্রিয় রাজপুত পরিবারে। ৮ থেকে ৩৪ বছর বয়স অবধি তিনি রাখালের কাজ করতেন। বর্ণগত দিক থেকে কোথায় তার যুদ্ধ করবার কথা তার বদলে কি না জম্ভেশ্বরের মধ্যে গড়ে উঠেছিলো প্রকৃতি ও প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসা!

১৪৮৫ সালে সমর্থল ধোরা গ্রামে জম্ভেশ্বর এক নতুন দর্শনের প্রচার আরম্ভ করেন। গুরু জম্ভেশ্বরের সে দর্শন লিপিবদ্ধ হয়েছিলো ১২০ শব্দে, ‘শবদবাণী’ নামে। নাগরী লিপিতে লেখা সে অনুশাসনে ধারা ছিলো ২৯টি।

মরু এলাকার মাটি ধুলোময় ও অনেকটাই আলগা। ল্যু হাওয়া থেকে সেগুলোকে বাঁচাতে বিশনয়ীরা সেখানে তৈরি করে গুল্মের ঝাড়। এতে শুধু মাটিই সুরক্ষা পায় না, বরং দুর্ভিক্ষকালে বিশনয়ীদের গবাদিপশুরাও পায় শুকনো-খাবার। কৃষ্ণসার ও চিঙ্কারা হরিণদের তেষ্টা মেটাতে তারা নিজেদের ক্ষেতের মাঝেই কুয়ো বানিয়ে রাখে।

বিলুপ্তপ্রায় কৃষ্ণসার হরিণের টিকে থাকতে চাই সবুজ পাতা। প্রকৃতিবন্ধু বিশনয়ীদের জন্যই প্রবল পানিশূন্যতা সত্ত্বেও রাজস্থানের মরুবুকে সবুজ পাতার অভাবে কোনো কৃষ্ণসারমৃগকে মরতে হয় না! পাখিদের বাসস্থান তৈরিতে ক্ষেতের মাঝে নির্দিষ্ট দূরত্বে উঁচু গাছও লাগায় এরা। এমনকি মাতৃহীন পশুশাবকদের নিজের বুকের দুধ খাওয়ায় বিশনয়ীরা।

ভয়েসটিভি/এএস
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/53484
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2021 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ