Printed on Thu Oct 21 2021 11:51:06 AM

ফোরজি তরঙ্গ ব্যবহারের ৫০ শতাংশও কার্যকর হয়নি

নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয়প্রযুক্তি
ফোরজি তরঙ্গ
ফোরজি তরঙ্গ
human hand and connected icons of IoT, abstract concept visual
সারাদেশে নিম্নমানের মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবার ব্যাপারে গ্রাহকের অভিযোগের  শেষ নেই। টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন দিয়েছেন। এতে উঠে এসেছে, দেশের শীর্ষ তিন মোবাইল অপারেটর কোম্পানি ফোরজি সেবা চালু করলেও এখন পর্যন্ত অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন ব্যবহারে কার্যকর করতেই পারেনি। গ্রাহক অনুপাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ বেতার তরঙ্গের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারেনি। তিনটি অপারেটর কোম্পানি নতুন বরাদ্দ নেওয়া বেতার তরঙ্গের প্রয়োগ গত ছয় মাসে ৫০ শতাংশও নিশ্চিত করেনি এবং মোবাইল ইন্টারনেট সেবার প্রয়োজনীয় পরিমাণ ব্যান্ডউইথও ব্যবহার করা হচ্ছে না। ফলে ভয়েস কলে ঘন ঘন ড্রপ এবং ইন্টারনেটের ধীরগতি রয়ে গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেতার তরঙ্গ ব্যবহার ও অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে সন্তোষজনক অবস্থায় আছে রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটক। ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার জানান, মোবাইল অপারেটরদের সেবার গুণগত মান বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার ব্যাপারে সম্প্রতি বিটিআরসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিটিআরসি এ নিয়ে কাজ শুরু করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অসহনীয় কলড্রপের বিড়ম্বনায় পড়ার কারণ 4G'র যুগে এসেও মাইক্রোওয়েভের ওপর নির্ভরশীল হয়ে সেবা দেয়া হচ্ছে গ্রাহকদের। ভবিষ্যতে ফাইভজিতে গেলেও কার্যক্ষেত্রে ওই মানের সেবা পাওয়া যাবে না বললেই চলে।

বিটিআরসির প্রতিবেদনে : ফোরজি সেবায় বর্তমানে মোবাইল অপারেটরদের মধ্যে বিটিএস পর্যায়ে (বেস ট্রান্সসিভার স্টেশন) গ্রামীণফোনের অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশনের ব্যবহার মাত্র ১২ শতাংশ, রবি আজিয়াটা লিমিটেডের ১৮ শতাংশ এবং বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশনের ১৩ শতাংশ। অর্থাৎ গ্রামীণফোনের যত বিটিএস আছে তার মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশের সঙ্গে অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগ আছে। ৮৮ শতাংশ চলছে মাইক্রোওয়েভ দিয়ে। বর্তমানে গ্রামীণফোনের মোট বিটিএস আছে ১৭ হাজার ৮২১টি শতভাগ ফোরজি সাইট। বিটিআরসির প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণফোনে বর্তমানে মাত্র ২ হাজার ১৩৮টি সাইটে অপটিক্যাল ফাইবার কানেকশন আছে। একইভাবে রবির বর্তমানে মোট বিটিএস সংখ্যা ১৩ হাজার ৭৬৬টি। ১৮ শতাংশ হিসেবে রবির মাত্র ২ হাজার ৪৭৮টি সাইটে অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগ আছে। বাংলালিংকের বিটিএস সংখ্যা ১০ হাজার ১৪৯টি। ১৩ শতাংশ হিসেবে অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন ব্যবহার হচ্ছে মাত্র ১ হাজার ৩১৯টিতে। টেলিটকের বিটিএস সংখ্যা ৫ হাজার ৪০০টি। ৬৭ শতাংশ হিসেবে ৩ হাজার ৬১৮টিতে অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন আছে।

আরো পড়ুন : দুই দিন মোবাইল নেটওয়ার্ক বিঘ্নিত হতে পারে

একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বর্তমানে তিনটি মোবাইল অপারেটর ট্রান্সমিশন সেবাদাতা এনটিটিএন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে সর্বোচ্চ ১৫০ এমবিপিএস থেকে ৫০০ এমবিপিএস ব্যান্ডউইথ পর্যন্ত ট্রান্সমিশন সেবা নিচ্ছে ব্যাকহল হিসেবে। যেখানে পার্শ্ববর্তী ভারত, শ্রীলংকায় অপারেটরদের ব্যবহূত ট্রান্সমিশন ব্যাকহলের পরিমাণ ১ জিবিপিএস (এক হাজার এমবিপিএস) থেকে ১০ জিবিপিএস। বর্তমানে বাংলাদেশের এনটিটিএন অপারেটরদের ব্যাকবোন ১০০ জিবিপিএস এবং ব্যাকহলে ১০ জিবিপিএস পর্যন্ত ব্যান্ডউইথ দেওয়ার ক্ষমতা আছে।

বিটিআরসির প্রতিবেদনে বেতার তরঙ্গ ব্যবহারের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, বর্তমানে গ্রামীণফোনের ৮ কোটি ২৩ লাখ গ্রাহকের বিপরীতে ৪৭ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ, রবির ৫ কোটি ১৮ লাখ গ্রাহকের বিপরীতে ৪৪ মেগাহার্টজ, বাংলালিংকের ৩ কোটি ৬৫ লাখ গ্রাহকের বিপরীতে ৪০ মেগাহার্টজ এবং টেলিটকের ৫৯ লাখ গ্রাহকের বিপরীতে ২৫ দশমিক ২ মেগাহার্টজ বেতার তরঙ্গ বরাদ্দ রয়েছে। গ্রাহক অনুপাতে বেতার তরঙ্গ বরাদ্দের এই চিত্র এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে সর্বনিম্ন।

সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক টেলিকম ইউনিয়নের ঘোষণা অনুযায়ী আদর্শ মোবাইল টেলিযোগাযোগ সেবার জন্য প্রতি ১ মেগাহার্টজ বেতার তরঙ্গ সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ গ্রাহকের জন্য বরাদ্দ থাকতে হবে। কিন্তু বিটিআরসির দেওয়া তথ্য বিশ্নেষণে দেখা যায়, গ্রামীণফোন প্রতি ২০ লাখ গ্রাহকের জন্য ১ মেগাহার্টজ, রবি প্রায় ১২ লাখ গ্রাহকের জন্য ১ মেগাহার্টজ এবং বাংলালিংক প্রায় ১১ লাখ গ্রাহকের জন্য ১ মেগাহার্টজ বেতার তরঙ্গ বরাদ্দ করেছে, যা আদর্শ মানদণ্ডের অনেক নিচে।
বিটিআরসির প্রতিবেদনে এ বিষয়ে আরও বলা হয়, চলতি বছরের মার্চ মাসে নতুন করে বেতার তরঙ্গ বরাদ্দ নেয় মোবাইল অপারেটররা। এর পর গত ছয় মাসে গ্রামীণফোন ৩৮ শতাংশ সাইটে (বিটিএস), রবি ৪৬ শতাংশ সাইটে এবং বাংলালিংক ৭০ শতাংশ সাইটে নতুন বরাদ্দ পাওয়া তরঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পেরেছে।

প্রতিবেদনে মোবাইল ইন্টারনেটের জন্য ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, বর্তমানে দেশের মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ৯২ শতাংশ মোবাইল ইন্টারনেট সেবা গ্রহণ করছেন। এই বিপুল সংখ্যক গ্রাহককে সেবা দেওয়ার জন্য বর্তমানে মোবাইল অপারেটররা দেশে মোট ব্যবহূত ব্যান্ডউইথের অর্ধেকেরও কম মাত্র ৪৫ শতাংশ ব্যবহার করছে। আদর্শ সেবা নিশ্চিত করতে ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের পরিমাণ সর্বোত্তম পর্যায়ে বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। সূত্র জানায়, গত ৩ অক্টোবর পর্যন্ত রেকর্ড অনুযায়ী পিক আওয়ারে (রাত ৮টা থেকে ১০টা) সর্বোচ্চ ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭০০ জিবিপিএস। এর মধ্যে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর (আইএসপি) ব্যবহূত ব্যান্ডউইথের পরিমাণ প্রায় ১৮০০ জিবিপিএস। বাকি ৯০০ জিবিপিএস মোবাইল অপারেটরদের। অর্থাৎ ৮ শতাংশ ব্রডব্যান্ড গ্রাহকের জন্য ১ হাজার ৮০০ জিবিপিএস এবং ৯২ শতাংশ মোবাইল গ্রাহকের জন্য ৯০০ জিবিপিএস বরাদ্দ ছিল।

বিটিএসের জন্য টাওয়ার ব্যবহারের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, বর্তমানে দেশের মোট টাওয়ারের ৬৬ শতাংশের মালিক মোবাইল অপারেটররা। আর টাওয়ার কোম্পানিগুলোর মালিকানাধীন টাওয়ারের সংখ্যা ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ। মাত্র ১৭ শতাংশ টাওয়ার শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে অন্য অপারেটররা সেবা দিচ্ছে। নেটওয়ার্কের দ্রুত বিস্তারে মোবাইল অপারেটরদের টাওয়ারগুলো শেয়ারিংয়ের জন্য উন্মুক্ত করা প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে মত দেওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য :টেলিযোগাযোগ খাত বিশেষজ্ঞ ও মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের সাবেক মহাসচিব টিআইএম নূরুল কবীর  বলেন, মাইক্রোওয়েভের ওপর নির্ভর করে আজকের ফাইভজির দুনিয়ায় মানসম্পন্ন গ্রাহক সেবা নিশ্চিত করা যাবে না। অবশ্যই অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশনে যেতে হবে। সেবার মান নিশ্চিত করতে হলে গুণগত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা কোয়ালিটি অব রেগুলেশন নিশ্চিত করতে হবে। আরও অনেক আগেই বিটিআরসির এই বিষয়গুলোতে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, মূলত গ্রাহক সংখ্যা, ভয়েস কল এবং মোবাইল ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধির তুলনায় অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশনের ব্যাকহল সক্ষমতা না বাড়ানোই কলড্রপ এবং মোবাইল ইন্টারনেটে ধীরগতির সবচেয়ে বড় কারণ। মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তিতে কোনোভাবেই অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশনের সক্ষমতার সমান সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ফাইভজি আসার আগে যদি এই চিত্রের বদল না হয় এবং অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগ ৮০ শতাংশে উন্নীত না হয়, তাহলে কোনোভাবেই ফাইভজি সেবা নিশ্চিত করা যাবে না।

অপারেটরদের বক্তব্য :রবি আজিয়াটা লিমিটেডের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম বলেন, বাংলাদেশের সামগ্রিক টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষত ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক অবকাঠামো যে এখনও ফাইভজি সেবা দেওয়ার উপযোগী নয়; বিটিআরসির সমীক্ষা প্রতিবেদনে সেটিই প্রতিফলিত। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে মোবাইল অপারেটরদের চাহিদা অনুযায়ী অতি দ্রুত লাস্ট মাইল ফাইবার কানেকটিভিটি দেওয়া প্রয়োজন। গত দেড় বছর ধরে ডব্লিউডিএম যন্ত্রপাতি আমদানির অনুমতি না মেলায় ফাইবার নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে আমাদের বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতিও হয়েছে। ফাইভজি উপযোগী ইকোসিস্টেমের প্রয়োজনে ফাইবার নেটওয়ার্ক তৈরিতে এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করার কোনো বিকল্প নেই।
এ ব্যাপারে গ্রামীণফোন ও বাংলালিংক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ট্রান্সমিশন সেবার ব্যাপারে দেশের বৃহত্তম প্রাইভেট এনটিটিএন অপারেটর ফাইবার অ্যাট হোমের হেড অব কমিউনিকেশন অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স আব্বাস ফারুক জানান, দেশের এনটিটিএন অপারেটররা গ্রাম পর্যায়ে অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগ বিস্তৃত করেছে। ফলে দেশে ট্রান্সমিশন সেবার সক্ষমতায় কোনো ঘাটতি নেই। মোবাইল অপারেটররা যে সক্ষমতা চায়, তা দেওয়ার সামর্থ্য এনটিটিএন অপারেটরদের আছে।

ভয়েস টিভি/এমএম
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/55091
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2021 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ