Printed on Tue Sep 28 2021 8:39:32 PM

বাংলাদেশি স্থপতির আবিষ্কৃত মেথডে তৈরি বুর্জ খলিফা

এম এস নাঈম
বিশ্বভিডিও সংবাদ
বাংলাদেশি স্থপতির আবিষ্কৃত মেথডে তৈরি বুর্জ খলিফা
বাংলাদেশি স্থপতির আবিষ্কৃত মেথডে তৈরি বুর্জ খলিফা
যদি জানতে চাওয়া হয় বিশ্বের সবচেয়ে উচু ভবনের নাম কি? একবাক্যে সকলে বলবেন, দুবাইতে অবস্থিত বুর্জ খলিফার নাম। উচ্চতায় বিশ্বের সমস্ত স্থাপনাকে ছাড়িয়ে যাওয়া বুর্জ খলিফার নাম সবাই জানলেও অনেকেই জানেন না স্থাপনাটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানান চমকপ্রদ ঘটনার কথা।

তেল নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে দুবাইয়ের সরকার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেয়। এতে সরকারের লক্ষ্য ছিল দেশের অর্থনীতিতে সেবা ও ভ্রমণের প্রভাব বাড়ানো। সেই পরিকল্পনার একটি অংশ বুর্জ খলিফা টাওয়ার নির্মাণ।

ভবনটি নির্মাণ করে ‘এসওএম’ বা স্কিডমোর, ওয়িংস অ্যান্ড মেরিল নামক একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রধান স্থপতি ছিলেন আদ্রিয়ান স্মিথ এবং বিল বেকার ছিলেন প্রধান নির্মাণ প্রকৌশলী। আর প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সুফিয়ান আল জাবিরি। প্রতিষ্ঠানটি বুর্জ খলিফার আগেও সিয়ার্স টাওয়ারের মতো গগণচুম্বী অট্টালিকা তৈরি করেছিল।

দুবাইয়ের মূল বাণিজ্যিক শহর ‘ডাউনটাউন দুবাই’ এর শেখ জায়েদ রোডে নির্মিত বুর্জ খলিফার উদ্বোধনের আগ পর্যন্ত নাম ছিল ‘বুর্জ দুবাই’। পরে আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সম্মানে ভবনটির নামকরণ করা হয় 'বুর্জ খলিফা'। তবে ভবনটিকে ‘দুবাই টাওয়ার’ নামে চেনেন অনেকেই।

২০০৪ সালের জানুয়ারি মাসে ‘বুর্জ খলিফা’র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ফেব্রুয়ারিতে পাইলিং শুরু হয়ে ২১ সেপ্টেম্বর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০০৫ এর মার্চ মাসে ‘বুর্জ খলিফা’ ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠতে থাকে। জুন ২০০৫ ভবনটির নির্মাণ কাজ ৫০ তলায় গিয়ে পৌঁছায়। ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ‘বুর্জ খলিফা’ বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন হিসেবে রেকর্ড বুকে অধিষ্ঠিত হয়। ২১ জুলাই ২০০৭ সালে ভবনটির নির্মাণকাজ ১৪১ তলায়, ১২ সেপ্টেম্বর ২০০৭ সালে ১৫০ তলায়, ৭ এপ্রিল ২০০৮ সালে ‘বুর্জ খলিফার’ নির্মাণকাজ ১৬০ তলায় গিয়ে পৌঁছে এবং ১ অক্টোবর ২০০৯ সালে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘বুর্জ খলিফা’র নির্মাণ কাজ সমাপ্ত ঘোষণা করে।

ভবনটি তৈরিতে ব্যয় হয় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা বাংলাদেশী টাকায় এগার হাজার ছয়শত সত্তর কোটি টাকা। সুউচ্চ ভবনটি নির্মাণকালীন অর্থ সঙ্কটে পড়েছিল দুবাই। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশের কাছ থেকে ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ নিয়েছিল দুবাই। ২০০৭-১০ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিক সংকটে ছিল দেশটি।

বুর্জ খলিফা তৈরিতে ব্যবহার করা হয় ‘বান্ডেলড টিউব’ পদ্ধতি যা বাংলাদেশি স্থপতি ফজলুর রহমান খান আবিষ্কৃত। তিনি সিয়ার্স টাওয়ার তৈরির সময় এই পদ্ধতি আবিস্কার করেন। ‘বান্ডেলড টিউব’ পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের চেয়ে উচ্চতায় প্রায় দ্বিগুণ রকেট আকৃতির বুর্জ খলিফা নির্মাণে মাত্র ৪ হাজার টন লোহা ব্যবহৃত হয়। এটি সম্ভব হয় বাংলাদেশের স্থপতি ফজলুর রহমান খানের আবিস্কৃত পদ্ধতির জন্য।

ভবনটি তৈরিতে যে পরিমাণ গ্লাস ও স্টিল ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো একসাথে রাখতে ১৭টি স্টেডিয়ামের সমান জায়গা প্রয়োজন হত। যে পরিমাণ ইট-বালি-সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে তা দিয়ে ১২৮৩ মাইল লম্বা দেওয়াল তৈরি করা যেত। ২০৬ তলাবিশিষ্ট ভবনটির মোট উচ্চতা ২ হাজার ৭১৭ ফুট। ছয় লাখ বর্গফুটবিশিষ্ট এই ইমারতটি একসঙ্গে ২৫ হাজার লোকের ভার সইতে পারবে। ঘণ্টায় ৪০ মাইল গতিতে চলা ৫৪টি এলিভেটর আটটি এস্কেলেটর এবং ২ হাজার ৯০৯টি সিঁড়ি রয়েছে।

১৫৮ তলায় পৃথিবীর উচ্চতম মসজিদ, ৫৫৫ মিটার উচ্চতায় পৃথিবীর উচ্চতম অবজারভেশন ডেক, ১২২ থেকে ২৪ তলায় রয়েছে ৪৪২ মিটার উচ্চতায় পৃথিবীর উচ্চতম স্কাই রেস্টুরেন্ট, পৃথিবীর উচ্চতম নাইট ক্লাব, ৫০৪ মিটারের পৃথিবীর দীর্ঘতম এলিভেটর, ১৬০টি ফ্লোর যা একটি ভবনে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ফ্লোর। ভবনটির ৭৬ এবং ৪৩ তলায় রয়েছে ছোটবড় দু'টি ‘বিচ এন্ট্রি সুইমিং পুল’।

বুর্জ খলিফার প্রথম ৪০ তলার মধ্যে ১৫টি ফ্লোরই রয়েছে চারটি আরমানি হোটেলের দখলে। ৫০-১০৮ তলার মধ্যে রয়েছে ৯০০টি বিক্রয়যোগ্য অ্যাপার্টমেন্ট। রয়েছে ১৬০ কক্ষবিশিষ্ট একটি হোটেল। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য বুর্জ খলিফা উদ্বোধনের মাত্র আট ঘণ্টার মধ্যেই সেগুলো বিক্রি হয়ে গিয়েছিল! বর্গ মিটার প্রতি ক্রেতাদের গুনতে হয়েছে গড়ে ৩৭ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার। অফিস-আদালতের জন্য মাসিক ভাড়া চার হাজার ডলার বা দুই লাখ ৮০ হাজার টাকা। অধিকাংশ স্থানই কর্পোরেট অফিস ও আবাসিক স্যুটের দখলে।

১৫৯ তলা পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবে যাওয়া গেলেও এর ওপরে উঠতে হলে অক্সিজেন নিয়ে যেতে হবে। কেননা সেখানে অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না। ভবনের ১৬০ থেকে ২০৬ তলা পর্যন্ত ফ্লোরগুলো ব্যবহার হয় কারিগরি কাজের জন্য। সবচেয়ে মজার বিষয় হল- সমতলের চেয়ে বুর্জ খলিফার বাসিন্দারা সূর্য সবার আগে দেখতে পান এবং দিন শেষেও তারা বেশি সময় সূর্য দেখতে পান। ফলে ভবনের বাসিন্দাদের কাছে দিনের পরিধি অনেক বেশি।

টাওয়ারটি আত্মহত্যার জন্য রেকর্ড গড়েছে। ২০১১ সালে এক ব্যক্তি ভবনটির ১৪৬ তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে ৩৮ তলায় পড়ে নিহত হন। এটিই এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে উঁচু স্থান থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করার রেকর্ড। যদিও এরপর অনেকেই ভবনটি থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন। ফলে অনেকেই ভবনটিতে অভিশাপ আছে বলে মনে করেন।

উচ্চাভিলাষী এবং ব্যয়বহুল এই ভবনটি নির্মাণ কাজের সঙ্গে জড়িত সাড়ে ৭ হাজার শ্রমিকের সঙ্গে মানবিক আচরণ করেনি দুবাই সরকার। শ্রমিকরা ৬ বছর কাজ করেছে দৈনিক মাত্র ২ দশমিক ৮৪ ডলার পারিশ্রমিকে। তাছাড়া কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় অঙ্গহানি ঘটেছে আরো অনেক শ্রমিকের। অথচ দুবাই সরকার এই শ্রমিকদের সাথে ন্যুনতম মানবিক আচরণটুকুও করেনি।

দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে যাওয়া বেশিরভাগ শ্রমিকদের বাসস্থান এবং খাবারের ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। রঙিন স্বপ্ন দেখতে দেখতে এই মানুষগুলো পাড়ি জমিয়েছিল আলো ঝলমলে দুবাই শহরে। অথচ তাদের সেই স্বপ্নের কোনো মূল্যই ছিল না দুবাই সরকারের কাছে। ফলে ২০০৬ সালে প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক তাদের মালিকপক্ষের বিপক্ষে বিদ্রোহ করেছিল, যদিও তার ফলাফল ছিল শূন্য।

এসব কিছুর পরও ভূপৃষ্ঠ থেকে পাহাড়সম উচ্চতায় দৃষ্টিনন্দন মানবসৃষ্ট স্থাপনার মেঘের রাজ্যে হানা দেওয়া বুর্জ খলিফা নির্মাণ প্রকৌশলকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়।

আরও পড়ুন : করোনার মধ্যেই দুবাই গিয়েছিলেন পরীমণি, ছিলেন বুর্জ আল খলিফায়

ভয়েস টিভি/এএন
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/52187
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2021 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ