Printed on Sun May 22 2022 2:47:31 PM

ভাষাসৈনিক মতিনের চোখে আলো দেখছেন রেশমা

নিজস্ব প্রতিবেদক
সারাদেশ
ভাষাসৈনিক মতিন
ভাষাসৈনিক মতিন
ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন প্রায় সাড়ে সাত বছর আগে মারা গেছেন। মরনোত্তর তার দান করা চোখের কর্নিয়ায় পৃথিবীর আলো দেখছেন ঢাকার ধামরাইয়ের স্বাস্থ্যকর্মী রেশমা নাসরীন (৩৫)। রেশমা তার দুই সন্তানকে ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের আদর্শে গড়ে তুলতে চান তিনি।

রেশমা নাসরীন ধামরাই উপজেলার সুয়াপুর গ্রামের সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট মৃত মো. আব্দুল বারেকের মেয়ে। তিনি সুয়াপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের একজন স্বাস্থ্যকর্মী। মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার চর আজিমপুর গ্রামের আব্বাস আলীর স্ত্রী রেশমা। ১৪ বছরের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস মীম এবং তিন বছরের ছেলে মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ রাইয়ানকে স্বামীর সঙ্গে নিয়ে চর আজিমপুর গ্রামেই বসবাস করছেন।

২০১৪ সালের ৮ অক্টোবর ৮৭ বছর বয়সে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন। মৃত্যুর আগে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মরণোত্তর দেহ দান করে যান। চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার জন্য তার দেহ এবং সন্ধানী চক্ষু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দুটি চোখ দান করেন এই ভাষা সংগ্রামী।

সেসময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের মৃত্যু ও তার চোখ দুটি সন্ধানীকে দান করে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। এমন খবর শুনে রেশমা নাসরীন ও তার পরিবার সন্ধানীর সঙ্গে যোগাযোগ করে। রেশমা তখন বাম চোখের কর্নিয়া সমস্যায় ভুগছিলেন। এরপর ২০১৪ সালের ৯ অক্টোবর সন্ধানী চক্ষু হাসপাতালে রেশমার বাম চোখে ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের ডান চোখের কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা হয়।

ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিন ছিলেন একজন সহজ-সরল মানুষ। তিনি খুব সাধারণভাবে জীবনযাপন করতেন। সব সময় দেশ ও দেশের মানুষের জন্য ভাবতেন। মরে গিয়েও তিনি দুইজনকে পৃথিবীর আলো দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন।

সোমবার ২১ ফেব্রুয়ারি দুপুরে মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার চর আজিমপুর গ্রামের স্বামীর বাড়ি থেকে রেশমা বলেন, সাত বছর বয়স থেকেই আমার চোখে সমস্যা দেখা দেয়। অনেক চিকিৎসা করিয়েও আমার চোখ ভালো না হওয়ায় পরিবারসহ আমি দুঃশ্চিন্তায় পড়ে যাই। চিকিৎসকরা বলেন, আমার বাম চোখের কর্নিয়া নষ্ট হয়ে গেছে। অল্প সময়ের মধ্যে অপারেশন করে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন না করলে আমি আর চোখে দেখতে পারব না। আমাদের আর্থিক অবস্থাও সেসময় তেমন ভালো ছিল না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভারতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।

তিনি বলেন, সেদিন (২০১৪ সালের ৮ অক্টোবর) টেলিভিশনের খবরে দেখতে পাই ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন মারা গেছেন এবং মৃত্যুর আগে তিনি তার দুটি চোখ সন্ধানীকে দান করেছেন। আমার পরিবার এর আগেই সন্ধানীর সঙ্গে যোগাযোগ করে রেজিস্ট্রেশন করেছিল। আমি সন্ধানীর সঙ্গে যোগাযোগ করি। পরে সন্ধানী চক্ষু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের ডান চোখের কর্নিয়া আমার বাম চোখে প্রতিস্থাপন করে।

রেশমা বলেন, আমি ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের কর্নিয়া পাওয়ার পর তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে চাই। কিন্তু আমি তাদের খুঁজে পাইনি। প্রায় সাড়ে সাত বছর অপেক্ষা করার পর চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর উত্তরার বাসায় আমি ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের পরিবাবের সঙ্গে দেখা করি। আমি এখন খুব খুশি।

রেশমা নাসরীনের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস মীম বলেন, আমার আম্মুর চোখের কর্নিয়া যখন পুরোপুরি অকেজো হয়ে যায়, তখন আমি অনেক ছোট ছিলাম। সে সময় আমার আম্মু ঠিকভাবে আমার ও পরিবারের কারও প্রতি ভালো মতো খেয়াল রাখতে পারত না। বড় হওয়ার পর মায়ের কাছেই শুনেছি, ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের দান করা চোখের কর্নিয়া আম্মুর চোখে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। আমার আম্মু একজন ভাষাসৈনিকের চোখ দিয়ে এই পৃথিবী দেখছে। এই বিষয়টি নিয়ে আমি অনেক গর্ববোধ করি এবং আমি অনেক খুশি। আমি ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনকে দেখিনি কিন্তু আমার আম্মুর চোখের দিকে তাকালেই আমি তাকে (ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন) দেখতে পাই। তিনি বেঁচে নেই, তবে তার চোখ এখনও আমার আম্মুর চোখের মাঝে বেঁচে আছে।

ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে রেশমা নাসরীন বলেন, আমি দুই চোখ দিয়েই দেখতে পাই। যদিও আমার চশমা লাগে। তারপরও এটা আমার পরম সৌভাগ্য যে, আমি শুধু একটি নতুন চোখই পাইনি, একজন ভাষাসৈনিকের চোখ পেয়েছি। যিনি নিজের জীবন বাজি রেখে মাতৃভাষা বাংলার জন্য আন্দোলন করেছেন। আমার বাবাও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। বাবার কাছে শুনেছি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের কথা। আমার দুই সন্তানকে ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের আদর্শে গড়ে তুলতে চাই।

ভয়েসটিভি/এমএম
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/67489
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2022 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ