Printed on Wed May 25 2022 4:21:37 AM

মুজিব তোমায় মনে পড়ে…

রোমান কবির
জাতীয়
মুজিব
মুজিব

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০১তম জন্মদিন আজ। এদিনে বাঙালির হৃদয়ে ধ্বনিত হয় আজকের এই দিনে মুজিব তোমায় মনে পড়ে। অন্নদা শঙ্কর রায়ের ভাষায়-‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান, ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান’। পল্লীকবি জসীম উদ্দীন ‘বঙ্গ-বন্ধু’ শিরোনামে লিখেছেন কবিতা-‘মুজিবর রহমান/ ওই নাম যেন বিসুভিয়াসের অগ্নি-উদারী বান।’


বঙ্গবন্ধু, যার হাত ধরেই হাজার বছরের শোষিত বাঙালি পেয়েছে মৃক্তির দিশা। এই বাঙালির জন্য বঙ্গবন্ধুর মাত্র ৫৪ বছরের জীবনের ১৪ বছরই কাটিয়েছেন কারাগারে। ফাঁসির মঞ্চেও গিয়েছেন হাসতে হাসতে। টুঙ্গিপাড়ার মিয়াভাই থেকে হয়েছেন বাঙালি জাতির মহানায়ক।


বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং মুজিববর্ষের বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এবার উদযাপিত হবে এ দিনটি। এর আগে বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মদিন থেকে শুরু হয় মুজিববর্ষ। যা এ বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। দিনটি জাতীয় শিশু কিশোর দিবস হিসাবেও উদযাপিত হবে।


বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি এবং আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোতেও  দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় উদযাপন করা হবে। দিনটিকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।


জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি এদিন ‘টুঙ্গিপাড়া হৃদয়ে পিতৃভূমি’ শীর্ষক বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে জাতির পিতার সমাধি সৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং বিকাল ২টা ৩০ মিনিটে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।


এদিকে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে আওয়ামী লীগ বৃহস্পতিবার থেকে সপ্তাহব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে। এবারের আয়োজনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘হৃদয়ে পিতৃভূমি’। ঢাকায় আগামীকাল সকালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এবং সারা দেশের সব কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। ওই দিন সকাল সাড়ে ৭টায় বঙ্গবন্ধু ভবনে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবে আওয়ামী লীগ।


রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এদিন টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণ করবেন।


ওই দিন একটি শিশু-কিশোর সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। যেখানে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা  যোগ দেবেন। বিকেলে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। ১৮ মার্চেও আওয়ামী লীগের উদ্যোগে টুঙ্গিপাড়ায় একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা সভায় অংশ নেবেন।


শেখ ‍মুজিবুর রহমানের জন্ম ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায়। বাবা শেখ লুৎফর রহমান ছিলেন সরকারি চাকুরে। মা সায়েরা খাতুন গৃহিণী। বাবা-মা আদর করে ডাকতেন ‘খোকা’ বলে। এই খোকাই কালে হয়ে ওঠে ইতিহাসের মহানায়ক।


গত শতকের সেই ৩০ এ দশকে এর মধ্যেই স্বদেশী আন্দোলন দেখে ইংরেজবিরোধী মনোভাব জেগে ওঠে বালক শেখ মুজিবের মনে। কিন্তু পরে কংগ্রেস-মুসলিম লীগ বিভাজনে মুসলিম লীগের প্রতি ঝুঁকে পড়েন তিনি, আর এক্ষেত্রে প্রভাব রেখেছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, রাজনৈতিক আজীবন যার মোহে আচ্ছন্ন ছিলেন শেখ মুজিব। গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুল, মিশনারি স্কুলে পড়াশোনার সময়ই রাজনীতির দীক্ষা হয়ে যায় শেখ মুজিবের।


স্কুলে পড়াকালেই ‘মুসলিম সেবা সমিতির’ সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করেন। সমিতির পক্ষ থেকে মুসলমান বাড়ি থেকে সংগৃহীত মুষ্টিভিক্ষার চাইলের অর্থ দিয়ে গরিব ছাত্রদের পড়ালেখা অন্যান্য খরচের জোগান দেওয়া হত।


১৯৩৮ সালে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক ও শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর গোপালগঞ্জ সফরে তাদের সংবর্ধনা দেন শেখ মুজিব। শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়েও সোচ্চার ছিলেন তিনি। তখনই সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তার যোগাযোগের শুরু। পরে বেঙ্গল মুসলিম ছাত্রলীগ গোপালগঞ্জ মহকুমার সম্পাদক হন। অল বেঙ্গল মুসলিম ছাত্রলীগের ফরিদপুর জেলা ও প্রাদেশিক কাউন্সিলরও হন তিনি। বেঙ্গল মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন ১ বছরের জন্য ১৯৪১ সালে। ওই বছরই তিনি দুই বার সাময়িকভাবে গ্রেপ্তার হন।


ভারত এবং পাকিস্তানের পাশাপাশি তৃতীয় রাষ্ট্র হিসেবে বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৪৭ সালে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন শেখ মুজিব। এই উদ্যোগ ব্যর্থ হলেও পরবর্তীতে এটাই তার স্বপ্নের রাষ্ট্র গড়ার ভিত্তি গড়ে দেয়।


১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ (বর্তমান আওয়ামী লীগ) গঠন হলে কারাগারে বন্দি অবস্থাতেই যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন শেখ মুজিব। এর মধ্যদিয়ে বিকশিত হতে থাকে তার রাজনৈতিক নেতৃত্ব।


১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক সরকারের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় গেলে গোপালগঞ্জ থেকে নির্বাচিত শেখ মুজিব সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে মন্ত্রিসভায় যোগ দেন; যদিও এক বছরও সেই সরকারকে থাকতে দেয়নি পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী।


আইয়ুব খানের সামরিক শাসনে কারাগারেই কাটাতে হয় শেখ মুজিবকে; কিন্তু তা বাঙালির নেতা হিসেবে তার ভিত্তি আরও মজবুত করে তোলে। এই সময় ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ নামে একটি গোপন সংগঠনও প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।


ষাটের দশকে বাঙালির রাজনৈতিক সংগ্রাম তুঙ্গে উঠলে তার অবিসংবাদিত নেতা হয়ে ওঠেন শেখ মুজিব। ১৯৬৬ সালে বাংলার শোষণ-বঞ্চনার অবসান দেন ৬ দফা, যা তখন জাতীয় মুক্তির সনদ হিসেবে গ্রহণ করে বাঙালি। এই ছয় দফা বাঙালি জাতির জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির বীজ যেমন বুনে দেয়, তেমনি পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের গোড়ায় হানে আঘাত।


বঙ্গবন্ধু একাত্তরে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র- এই চার মূল নীতি নিয়ে বঙ্গবন্ধু যে দেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের পথচলা উল্টো দিকে বেঁকে যায়।


বিশ্ব গণমাধ্যমের চোখে বঙ্গবন্ধু ছিলেন ক্ষণজন্মা পুরুষ। অনন্য সাধারণ এই নেতাকে ‘স্বাধীনতার প্রতীক’ বা ‘রাজনীতির ছন্দকার’ খেতাবেও আখ্যা দেওয়া হয়। বিদেশি ভক্ত, কট্টর সমালোচক এমনকি শত্রুরাও তাদের নিজ নিজ ভাষায় তার উচ্চকিত প্রশংসা করেন।


বিংশ শতাব্দীর কিংবদন্তী কিউবার বিপ্লবি নেতা প্রয়াত ফিদেল ক্যাস্ট্রো বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হিমালয়ের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। শ্রীলংকার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লক্ষ্মণ কাদির গামা বাংলাদেশের এই মহান নেতা সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়া গত কয়েক শতকে বিশ্বকে অনেক শিক্ষক, দার্শনিক, দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক, রাজনৈতিক নেতা ও যোদ্ধা উপহার দিয়েছে। কিন্তু, শেখ মুজিবুর রহমান সবকিছুকে ছাপিয়ে যান, তার স্থান নির্ধারিত হয়ে আছে সর্বকালের সর্বোচ্চ আসনে।


ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় ২০১৩ সালের ৪ মার্চ নগরীর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন শেষে মন্তব্য বইয়ে এমন মন্তব্য লিখেছিলেন।


ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং মন্তব্য বইয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার সম্মোহনী এবং অসীম সাহসী নেতৃত্বের মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধে তার জনগণের নেতৃত্বদান করেছিলেন। ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি সোনিয়া গান্ধী বলেন, ‘দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন নেতা এবং রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি আমি শ্রদ্ধা জানাই। তিনি স্বাধীনতার জন্য প্রতিকূলতা ও বিরূপ পরিস্থিতি উপেক্ষা করে অটল সাহসিকতার সাথে লড়াই করেছেন।’


ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্ধ্যোপাধ্যায় তার বাংলাদেশ সফরের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেছিলেন। এ সময় মন্তব্য বইয়ে তিনি লিখেন, এই উপ-মহাদেশের প্রতিটি মুক্তিকামী, মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানুষের মনে বঙ্গবন্ধু এক জ্বলন্ত অনুপ্রেরণা। তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি, স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্থপতি এবং পিতা। মমতা বলেন, বাংলা ভাষাকে বিশ্বের মঞ্চে অন্যতম শ্রেষ্ঠত্বে মর্যাদা এনে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। তিনি সেই বিরল নেতা, যার প্রতি ধর্মমত নির্বিশেষে সকল মানুষ প্রণাম জানিয়ে ধন্য হয়।


ভয়েসটিভি/আরকে
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/69849
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2022 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ