Printed on Tue May 24 2022 6:59:55 PM

কান খাড়া করে থাকি- এই বুঝি বাজল যুদ্ধের সাইরেন

নিজস্ব প্রতিবেদক
বিশ্ব
যুদ্ধের সাইরেন
যুদ্ধের সাইরেন
রাশিয়ার হামলার আতঙ্কে এখন পুরো ইউক্রেনের থমথমে অবস্থা। কি শহর কিংবা গ্রাম- সর্বত্রই উৎকণ্ঠা, দমবন্ধ পরিস্থিতি। চরম উদ্বেগে কাটছে প্রতিটি মুহূর্ত। বেশিরভাগ মানুষ ঘরে থাকছে। ভয়ার্ত পরিবেশে কাটছে তাদের দিন।

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে আছি ৩৮ বছর। টাঙ্গাইলের বাসাইল থেকে রাশিয়ায় পড়াশোনা শেষে এখন ইউক্রেনে বসবাস করছি। স্ত্রী ও দুই সন্তান আমার সঙ্গেই থাকে। ওরা পড়াশোনা করছে। মেয়েটি ছোট। সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হলো, আমার মেয়ের মতো ছোট শিশুরাও আতঙ্কে ভুগছে। নানাভাবে ওরা খবর পাচ্ছে, যে কোনো সময় হামলা চালাতে পারে রাশিয়া। রুশ নেতারা এই শিশুদের মানসিক অবস্থা কি জানেন?

২০১৪ সালে ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া অঞ্চল কেড়ে নেওয়ার পর রাশিয়ার বিরুদ্ধে এ দেশের মানুষের মনোভাব ব্যাপক বদলে গেছে। আগে থেকেই রুশ শাসনের প্রতি বেশিরভাগ ইউক্রেনীয়র অনাস্থা ছিল। তবে বিভিন্ন কৌশলে রুশপন্থি সরকার ক্ষমতায় বসিয়ে সেই ভাবাবেগ দমন করেছে মস্কো। এসব কথা ইউক্রেনীয়রা জানে ও বোঝে। ফলে ক্ষোভ ছিলই। তবে এবার যখন সীমান্তে লক্ষাধিক সেনা মোতায়েন করল রাশিয়া, তখন থেকে ইউক্রেনীয়দের সেই ক্ষোভ আর চাপা নেই, বিস্ম্ফোরিত হয়েছে।

ডিসেম্বর মাস থেকে সীমান্তের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাওয়ায় ইউক্রেন সরকার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় নেতাদের সহযোগিতা নিচ্ছে। প্রচুর অস্ত্র ও বিপুল অর্থ আসছে বলে শুনেছি। এর প্রভাব পড়েছে নাগরিকদের ওপর। পুরো ইউক্রেনবাসী এখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে একাট্টা। কয়েক সপ্তাহ ধরে দেখা যাচ্ছে, ছোট ছোট দল করে সামরিক প্রশিক্ষণ নিচ্ছে বিভিন্ন বয়সী মানুষ, তার মধ্যে ৭০-৮০ বছর বয়সী নারী-পুরুষও আছেন। বহু কিশোর-তরুণ অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।
সামরিক চিত্রের উল্টো আছে ভয়ের পরিবেশ। কয়েক সপ্তাহ হলো রাজধানী কিয়েভের রাস্তায় ব্যস্ততা নেই। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হন না। আমরা কান খাড়া করে থাকি- এই বুঝি যুদ্ধের সাইরেন বেজে উঠল!
কিয়েভের বড় বড় শপিংমল, মার্কেট ও খেলার মাঠ, পার্ক বলতে গেলে জনশূন্য। আকাশে বিমানের গর্জন শুনলেই মানুষ আঁতকে ওঠে। শিশুরা ঘরের কোণে লুকিয়ে পড়ে। যদিও হামলার কোনো ঘটনা এখনও ঘটেনি।

আমার মতো অনেকে দোকান খুলে বসে থাকেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। দিনে দু-একজন ক্রেতা পাওয়া এখন ভাগ্যের ব্যাপার। ব্যবসা-বাণিজ্য থমকে গেছে। যুদ্ধের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় জিনিসপত্রের দামও বেড়ে গেছে।
ভয়ের মধ্যে ইউক্রেনের মানুষের চোখ এখন টেলিভিশন ও অনলাইনে। রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কী কথা হচ্ছে, কী ঘটতে যাচ্ছে- এসবই সবাই জানতে চাইছে।

রাশিয়া যে কোনো সময় হামলা চালাতে পারে- এমন আশঙ্কা থেকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশ তাদের কূটনীতিক ও নাগরিকদের সরিয়ে নিচ্ছে। এতে করে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। সবার ধারণা, সত্যিই হামলা চালাবে পুতিনের রাশিয়া।

এমন আতঙ্কের মুহূর্তে বাংলাদেশের পোল্যান্ড দূতাবাস থেকে ইউক্রেনে থাকা বাংলাদেশিদের জন্য নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। তাতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, বাংলাদেশিরা যেন ইউক্রেন ত্যাগ করে এবং নতুন করে কেউ যেন ইউক্রেনে ভ্রমণে না আসে। এ বিষয়ে ই-মেইল ও মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠানো হচ্ছে।

ইউক্রেনে বাংলাদেশের কোনো দূতাবাস বা স্থায়ী কনস্যুলেট নেই। একটি অস্থায়ী কনস্যুলেট থাকলেও যে কোনো কাজের জন্য আমাদের পোল্যান্ড দূতাবাসের ওপরই নির্ভর করতে হয়। ইউক্রেনে আনুমানিক ৫০০ বাংলাদেশি থাকতে পারে অথবা এর চেয়ে কিছু বেশিও হতে পারে। বাংলাদেশ থেকে নির্দেশনা জারির আগেই যুদ্ধের আশঙ্কায় ইউক্রেনে পড়াশোনা করা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা চলে গেছেন। এখনও যে বাংলাদেশিরা এখানে আছেন, তাদের অনেকের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি যা-ই হোক ইউক্রেন ছাড়বেন না।

চরম উত্তেজনার এই সময়ে যখন খবর এলো সীমান্ত থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়া শুরু করছে রাশিয়া, তখন দেখলাম কিছুটা স্বস্তি ফিরছে। কেউ কেউ বাসা থেকে বেরিয়েছেন। পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছেন তারা।

ইউক্রেনে ৩৮ বছর থাকার যে অভিজ্ঞতা, তা থেকে বুঝেছি, ইউক্রেনীয়রা রাশিয়ার নেতাদের বিশ্বাস করেন না। সোভিয়েত আমলে ইউক্রেনের ওপর নানা রকম দমন-পীড়ন ও শোষণ হয়েছে। দিনের পর দিন এই তিক্ত অভিজ্ঞতা ইউক্রেনের জনগণ টেনে নিয়ে বেড়াচ্ছে। তবে অনেককে বলতে শুনেছি, রাশিয়া যদি ভালো ব্যবহার করত, ইউক্রেনে উন্নয়ন করত, তাহলে তারা মস্কোর বিকল্প কিছুই ভাবত। তা হয়নি। ইউক্রেনকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে রেখেছে রাশিয়াই। এ দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে গণতন্ত্রের যে আকাঙ্ক্ষা দেখা যাচ্ছে, তা সত্যিই নবজাগরণ বলতে হয়। তারা কেউ রাশিয়ার সঙ্গে থাকতে চায় না। ইউক্রেনে রুশভাষী ছোট অংশ আছে, তারা অবশ্য রাশিয়াপন্থি।

সূত্র : সমকাল

ভয়েসটিভি/এমএম
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/67025
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2022 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ