Printed on Fri Jul 01 2022 7:05:49 PM

রুপসা-ভৈরবের মিলনস্থল খুলনার দর্শনীয় স্থান

খুলনা প্রতিনিধি
সারাদেশভ্রমণভিডিও সংবাদ
রুপসা নদী আর ভৈরব নদের মিলনস্থলে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম বিভাগের মূল সদর খুলনা জেলা অবস্থিত। তবে খুলনা নামকরণ কীভাবে হয়েছে তা সুনির্দিষ্ট ভাবে জানা যায়নি । ঐতিহাসিকগণের মতে খুলনা এসেছে “খুল্লনা” শব্দ থেকে যার অর্থ ক্ষুদ্র নৌকা ভাসে এমন স্থান।

ধনপতি সওদাগরের স্ত্রী খুল্লনেশ্বরী দেবীর নামানুসারে খুলনা নামকরণ হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। আবার কেউ কেউ বলেন, আরব বণিকেরা এ জেলাকে বলতো “আদ খোলনা”। এই “আদ খোলনা শব্দ থেকে খুলনা শব্দের উৎপত্তি ।
১৭৬৬ সালে পশুর নদীর দক্ষিণভাগে নিমজ্জিত “ফল মাউথ” নামক জাহাজের নাবিকদের রেকর্ড পত্রে খুলনাকে “কুলনিয়া” বা “কলনিয়া” বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বাধীনতা-সংগ্রাম, শিক্ষা-সংস্কৃতি, খেলাধুলা বিভিন্ন বিষয়ে খুলনার রয়েছে অনেক সমৃদ্ধ ইতিহাস । রয়েছে বিভিন্ন প্রসিদ্ধ স্থান। সুন্দরবন, শহীদ হাদিস পার্ক, ডুমুরিয়ায় চুকনগর বধ্যভূমি, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, খানজাহান আলী সেতু, গল্লামারী স্মৃতিসৌধ। এছাড়া রয়েছে ঐতিহ্যবাহী কাস্টমঘাট ও কুয়েট ক্যাম্পাস।

সুন্দরবন : বাংলাদেশের উপকূলীয় ৫টি জেলার ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার জায়গা নিয়ে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন। দেশের সর্বদক্ষিণের খুলনার তিনটি উপজেলা দাকোপ,পাইকগাছা ও কয়রা সুন্দরবন বেষ্টিত । তাই খুলনাকে সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার বলা হয়। সুন্দরবনের মোট জলাভূমির পরিমান ৩০ শতাংশ। সুন্দরবন থেকে আহরিত মধু দেশের মোট মধু উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশেরও বেশি। সুন্দরবন ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কোর ‘বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী' স্থান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ প্রায় ৭শ ৬৭ প্রজাতির জীব বৈচিত্রের সমারোহ রয়েছে এই বনে। আর এই জীব বৈচিত্রের মধ্যে রয়েছে সুন্দরী, গরান, গেওয়া ও গোলপাতাসহ ২শ ৩৪ প্রজাতীর গাছ, ৩শ ৩ প্রজাতীর মাছ, কুমির, ডলফিন, হাঙ্গর, বিরল প্রজাতির কচ্ছপ ও বিষধর সাপসহ বিভিন্ন জীববৈচিত্র।

ঐতিহাসিক শহীদ হাদিস পার্ক : খুলনা নগর ভবন আর ঐতিহাসিক যশোর রোডের মধ্যস্থলে এই পার্কটির অবস্থান। এই পার্কটি শুধুই একটি বিনোদন কেন্দ্র নয়, এর রয়েছে সুপরিচিত অতীত ইতিহাস ঐতিহ্য । বহু আন্দোলন সংগ্রামের সূতিকাগার খুলনার ঐতিহাসিক শহীদ হাদিস পার্ক।

দৃষ্টিনন্দন এই পার্কে প্রাত:ভ্রমণ ও সান্ধ্যকালীন ভ্রমণ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড- চলে প্রতিদিনই। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে খুলনার সকল আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে শহীদ হাদিস পার্ককে ঘিরে। এ পার্কেই রয়েছে খুলনার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার।

সংগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিজড়িত শহীদ হাদিস পার্কটি আগে বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। ১৮৮৪ সালে খুলনা পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে শহরবাসীর বিনোদনের জন্য পৌরসভা কর্তৃপক্ষ খুলনা মিউনিসিপ্যাল পার্ক নামে এই পার্ক প্রতিষ্ঠা করে । ১৯২৫ সালের ১৬ জুন এই পার্কে মহাত্মা গান্ধী বক্তব্য রাখেন। তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে পার্কের নামকরণ করা হয় গান্ধী পার্ক।

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর পার্কের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় জিন্নাহ পার্ক। এরপর আবার নামকরণ হয় খুলনা মিউনিসিপ্যাল পার্ক। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খান বিরোধী গণআন্দোলন শুরু করে খুলনার জনগণ। ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল নয়টায় এই পার্কের কাছেই পাকিস্তানী স্বৈরশাসক বিরোধী মিছিলে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন শেখ হাদিসুর রহমান বাবু । পরে শহীদ শেখ হাদিসুর রহমান বাবুর নামে এ পার্কের নামকরণ করা হয়।

চুকনগর বধ্যভূমি : ১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত হয় চুকনগর গণহত্যা।এ গণহত্যা বিশ্বের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সরবৃহৎ একক গণহত্যা ।১৯৭১ সালের ২০ মে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে খুলনার ডুমুরিয়ার চুকনগরে পাকিস্তানি সেনারা পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম ও নির্মম এই গণহত্যা ঘটায়।

অতর্কিত এ হামলা চালিয়ে মুক্তিকামী ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে তারা। স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে চুকনগরের গণহত্যা এক কালো অধ্যায় রচনা করেছে। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনারা যে নির্মম অত্যাচার, নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, তার এক নীরব সাক্ষী হয়ে আছে আজকের চুকনগর বধ্যভূমি।

আজও চুকনগরের ফসলি জমিগুলোয় পাওয়া যায় সেদিনের শহীদদের হাড়গোড়, তাদের শরীরে থাকা বিভিন্ন অলঙ্কার। চুকনগরে সেদিন কতো লোক জমায়েত হয়েছিলেন তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। অনেকের ধারণা ৫০ হাজারেরও অধিক। এ স্থানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে। “চুকনগর শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ” নামে পরিচিত।

দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্স : দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্স বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত একটি স্থান, যা খুলনার ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণডিহিতে অবস্থিত। খুলনা শহর থেকে ১৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ফুলতলা উপজেলার তিন কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে দক্ষিণডিহি অবস্থিত। এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মা সারদা সুন্দরী দেবী জন্ম গ্রহণ করে ছিলেন এই দক্ষিণডিহি গ্রামে। যৌবনে কবি কয়েক বার তার মায়ের সঙ্গে দক্ষিণডিহি গ্রামের মামা বাড়িতে এসেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবী দক্ষিণ ডিহিরই মেয়ে। তার ভালো নাম ভবতারিণী, বিবাহের পর তার নাম রাখা হয় মৃণালিনী দেবী। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ি দক্ষিণডিহির ভবনটি দ্বিতল বিশিষ্ট।

এই ভবনের উপর একটি চিলেকোঠা রয়েছে। মূল ভবনের নীচ তলায় ৪টি এবং দ্বিতলে ২টি কক্ষ রয়েছে। দক্ষিণ দিকে একটি বারান্দা আছে। পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা এই ভবনটি ১৫ দশমিক ৫৫ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৭ দশমিক ৮৮ মিটার প্রস্থ। ভবনের স্থাপত্য ও গঠন কাঠামোতে বৃটিশ যুগের স্থাপত্য রীতিনীতির প্রভাব সুস্পষ্ট। সম্ভবত উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এই ভবন নির্মিত হয়েছিল। এখানে কবিগুরু ও কবিপতির আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। প্রতি বছরইএখানে রবীন্দ্রজয়ন্তী ও কবিপ্রয়াণ দিবস পালন করা হয়।

খান জাহান আলী সেতু : খানজাহান আলী সেতু খুলনার রূপসা নদীর উপর নির্মিত একটি সেতু। এটি রূপসা সেতু নামেও পরিচিত। খুলনা শহরের রূপসা থেকে ব্রিজের দূরত্ব প্রায় ৫ কিলোমিটার। এই সেতুকে খুলনা শহরের প্রবেশদ্বার বলা যায় কারণ এই সেতু খুলনার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলির বিশেষত মংলা সমুদ্র বন্দরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে।

সেতুটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১ দশমিক ৬০ কিলোমিটার ও প্রস্থ ১৬ দশমিক ৪৮ মিটার। এই সেতুর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো দুই প্রান্তে দুটি করে মোট চারটি সিঁড়ি রয়েছে যার সাহায্যে মূল সেতুতে উঠা যায়। সেতুটিতে পথচারী ও অযান্ত্রিক যানবাহনের জন্য বিশেষ লেন রয়েছে। বর্তমানে এটি খুলনার একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। রাতে সেতুর উপর থেকে খুলনা শহরকে অপূর্ব সুন্দর মনে হয়।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় : খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের নবম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। খুলনা শহর থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের পাশে ১০৬ একর জমির ওপর এই বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থিত। ১৯৯১ সালে ৩১ আগষ্ট ৪টি বিভাগে ৮০ জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে একটি দোতলা ভবনে শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ডিসিপ্লিনের সংখ্যা ২৯টি।

যেখানে প্রায় ৭ হাজার শিক্ষার্থীকে ৫০০ শিক্ষক পাঠদান করে থাকেন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ই দেশের একমাত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে শুরু থেকেই ছাত্র রাজনীতি মুক্ত। তবে ২৭টি ছাত্র সংগঠন রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে রয়েছে অদম্য বাংলা, মুক্তমঞ্চ, শহীদ মিনার, কটকা স্মৃতিসৌধ। গবেষণা পরিচালনার জন্য একটি রিসার্চ সেল ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।

ভয়েসটিভি/এএস
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/14812
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2022 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ