Printed on Mon Oct 18 2021 12:16:38 AM

কল্পকাহিনীতে ঘেরা ৫ শ বছরের শিমুল গাছ

নাঈম ইসলাম, শেরপুর
সারাদেশভ্রমণ
শিমুল
শিমুল
শেরপুর জেলার সবচেয়ে বৃহত্তম শিমুল গাছটি ঘিরে রয়েছে নানা কল্পকাহিনী। বহন করছে নানা ঐতিহ্য। ঐতিহাসিক বিভিন্ন ঘটনার স্বাক্ষী এই শিমুল গাছটি। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গাছটির বয়স পাঁচ থেকে ছয় শ বছর। এটি ঘিরে বসে বৈশাখী মেলা। এর ছায়ায় প্রশান্তি পান ক্লান্ত পথিক। তবে বৃহদাকৃতির এ গাছটি ধীরে ধীরে অস্তিত্ব হারাচ্ছে। তাই এটি বৈজ্ঞানিক উপায়ে রক্ষণাবেক্ষণের দাবি স্থানীয়দের। গাছটি ঘিরে পর্যটনেরও বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে বলে মত এলাকাবাসীর।

নকলা উপজেলা শহর থেকে ৭ কিলোমিটার দক্ষিণে নারায়ণ খোলা গ্রামে গাছটির অবস্থান। ৫০ শতাংশ জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় ১০০ ফুট লম্বা শিমুল গাছটির গোড়ার পরিধি প্রায় ৪৬ গজ।

গাছটির গোড়ায় দাঁড়িয়ে কখনো মনে হয় পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতি। এর বিশালতায় ভরে যায় মন। এখানে এলে মুদ্ধতার আবেশে ছড়িয়ে যায় দর্শনার্থীর হৃদয়। আলোচিত এই গাছটি দেখতে তাই দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন অনেকেই। পহেলা বৈশাখে মেলা বসে গাছটি ঘিরে।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্বাস আলি বলেন, আমি বাপ-দাদার কাছ থেকে শুনে আসছি এই বেড় শিমুলের বয়স কমপক্ষে ৫ শ বছর হবে। আবার গ্রামের অনেকেই বলেছে, গাছটির বয়স ৬ শ বছর বা তারও বেশি হবে।

গাছটির পশ্চিম পাশের কাণ্ড হাতি সদৃশ এবং উত্তর পাশ নৌকার বৈঠা, রশি, পেঁচা ও সাপের সদৃশ। গাছটির যে কোনো একটি শাখা নাড়া দিলে সমগ্র গাছ নড়ে ওঠে। বিস্তৃত শিমুলগাছে সারাক্ষণই চলে পাখির কিচির-মিচির। কয়েক প্রজাতির পাখির আনাগোনা শুধু এই গাছকে কেন্দ্র করেই।

প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গাছটি বেড়ে উঠেছেও প্রাকৃতিকভাবেই। একসময় বেড় শিমুল গাছটি পত্র-পল্লবে এতটাই ঘন ছিল যে এর নীচে রোদ, বৃষ্টি, কুয়াশাও পড়ত না। প্রচণ্ড গরমের সময়ও গাছের নীচে পাওয়া যেত হিমেল শান্তির পরশ। পথিক, কৃষক থেকে শুরু করে নানা পেশা ও শ্রেণির লোকজন গাছের তলায় শুয়ে-বসে বিশ্রাম নিত। দুপুর ও বিকেলে দেখা যেত ডালে ডালে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন অনেকে।

গাছটি যার জমিতে আছে তিনি তার বাবার পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে পেয়েছেন, তিনি আবার তার বাবার কাছ থেকে এভাবেই চলে আসছে শতাব্দী থেকে শতাব্দী ধরে। কিন্তু কেউ বলতে পারে না এর জন্মলগ্নের সঠিক ইতিহাস।

গাছটিকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে নানান কল্পকাহিনী। অনেকে মনে করেন, গাছটিতে ভৌতিক আসর বসে। রয়েছে জ্বিন-পরীদের নিয়মিত আনাগোনা। আবার অনেকে মনে করেন গাছের গোড়ায় গুপ্তধন আছে। বিশালাকারের একটি সাপ দেখা যায় মাঝেমধ্যে, গাছে কোপ বা ঢিল দিলে রক্ত বের হয়- এ ধরনের কল্পকাহিনী ছড়িয়ে রয়েছে এলাকায়। এলাকাবাসী তা বিশ্বাসও করেন।

অনেক আগে নাকি গাছটি বিক্রি করা হয়েছিল। লোকেরা গাছের একটি ডাল কাটতেই নাক ও মুখ দিয়ে রক্ত আসতে শুরু করে। তারপর থেকে গাছের মালিক আর এটি বিক্রি করেননি, কেউ কিনতেও আসেননি।

জনশ্রুতি আছে যে, গরিব-দুঃখীর বিয়ের সময় নাকি বিবাহের কথা বললে, কাঁসার থালা, বাসন, ঘটি-বাটি ইত্যাদি কিছুক্ষণ পর গাছের নীচে পাওয়া যেত। আবার কাজ শেষে সমস্ত জিনিস ফেরত দিতে হত, যদি কেউ লোভ করে দুই একটা জিনিস রেখে দিত তবে অদৃশ্যভাবে ভয়-ভীতি দেখানো হত। তাই মানুষের লোভের কারণে এ জিনিস দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে গাছটি। জীবনের চলার পথে বিপদে আপদে এই গাছের নিচে মান্নত করলেও নাকি উপকার পাওয়া যেত।

শেরপুর জেলা প্রশাসক ড. মল্লিক আনোয়ার হোসেন ও নকলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিব কুমার সরকার গাছটি দেখতে এসে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়ার আশ্বাস দেন।

স্থানীয়রা জানায়, প্রশাসনের অযত্ন-অবহেলা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও নানামুখী অত্যাচারের কারণে ঐতিহ্যবাহী বেড় শিমুল গাছটি অস্তিত্ব বিলীনের হুমকিতে পড়েছে। মারা যাচ্ছে অনেক পরজীবী গাছ। ভেঙে পড়ছে বড় বড় ডালগুলো।

ময়মনসিংহ থেকে গাছটি দেখতে আসা শাহরিয়ার সুমন জানান, তিনি আশ্চর্যজনক বিশালাকৃতির গাছটি দেখে অভিভূত হয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের অনেক স্থানে বেড়িয়েছেন কিন্তু এমন দৃষ্টিনন্দন গাছ কোথাও দেখেননি।

তিনি বলেন, এ গাছটি নিয়ে মিডিয়ায় প্রচার হলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নজর কাড়বে। একই কথা জানালেন শেরপুর শহর থেকে আসা যুবক আরিফুর রহমান আকিব, জিয়া সরকার, মনিরসহ আরও অনেকে।

স্থানীয় বাসিন্দা শামসুল হক বলেন, চারিদিকে খোলামেলা পরিবেশ থাকায় ধীরে ধীরে পিকনিক স্পট হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেছে। এই বেড় শিমুল গাছের নীচে চলচ্চিত্রের শুটিংও হয়েছিল। এখনও মাঝেমধ্যে নাটক ও টেলিফ্লিমের শুটিংও হয়।

খ্যাতিমান অভিনেতা অমিত হাসান, আলিরাজ, আনোয়ারা, জয়, জাবেদসহ আরও অনেকেই এখানে শুটিং করার জন্য এসেছেন বলে জানান স্থানীয়রা।

‘বিশ্ব ভ্রমণকন্যা’ এলিজা বিনতে এলাহী বিশালাকৃতির দৃষ্টিনন্দন এই বেড় শিমুল গাছটি দ্রুত সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) জাহিদুর রহমান জানান, এই বেড় শিমুল গাছ ও গাছটির আশপাশ এলাকা পর্যটন এলাকা হিসেবে ঘোষণার জন্য জেলা প্রশাসনসহ ঊর্ধতন দফতরে ছবি ও তথ্যসহ লিখিত আবেদন পাঠানো হয়েছে।
এ গাছের ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষায় সংশ্লিষ্ট ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের আবারও স্মরণ করিয়ে দেবেন বলে তিনি জানান।

তিনি আরও জানান, যেহেতু গাছ ও গাছের জায়গাটি সরকারি তথা খাস নয়, বরং ব্যক্তি মালিকানা। অতএব ইচ্ছা করলেই খুব সহজেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে জোড়ালো কোনো পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া জায়গার ওপরে মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলমান আছে বলেও তিনি জানান। তিনি বলেন, যেহেতু গাছটি ঐতিহ্যবাহী, স্বাভাবিক কারণেই গাছটি দেখতে দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকরা আসেন। তাই পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য বা বসার জন্য ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ইট-সিমেন্টের বেঞ্চ বানিয়ে দিয়েছি। পুরোনো এ গাছটি সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

দর্শনার্থী টানতে এলাকাবাসী বিশালকৃৃতির দৃষ্টিনন্দন এ গাছটি সম্পর্কে প্রচারণা ও মূল রাস্তা থেকে গাছের গোড়া পর্যন্ত পাকা সংযোগ সড়ক তৈরিসহ বৈজ্ঞানিক উপায়ে রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।

ভয়েস টিভি/এসএফ
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/25218
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2021 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ