Printed on Wed May 25 2022 4:36:29 AM

নাপা সিরাপ খেয়ে দুই শিশুর মৃত্যু, পলাতক ফার্মেসি দোকানি

নিজস্ব প্রতিবেদক
সারাদেশ
শিশুর মৃত্যু
শিশুর মৃত্যু
ব্রাহ্মণবাড়িয়া আশুগঞ্জে নাপা সিরাপ খেয়ে ইয়াছিন মিয়া (৭) ও মোরসালিন মিয়া (৪) নামে দুই শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমতবস্থায় দোকান বন্ধ করে পালিয়েছে ফার্মেসি মালিক। স্বজনদের অভিযোগ গরীব বলে হাসপাতালে সুচিকিৎসা না পেয়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

নিহতরা উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের নজরবাড়ির ইটভাটা শ্রমিক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ইসমাইল হোসেন সুজনের দুই সন্তান। তিনি সিলেট গোলপগঞ্জের একটি ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করেন।

দুই শিশুর মা রীমা আক্তারও স্থানীয় একটি রাইস মিলের শ্রমিক। একসঙ্গে দুই শিশু মৃত্যু হওয়ার দরিদ্র শ্রমিক সুজন-রেখা দম্পতি একেবারে নিঃসন্তান হয়ে গেলেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে শিশুদের নিজবাড়িতে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।

জানা যায়, শিশু দুটির হঠাৎ জ্বর হওয়ায় বৃহস্পতিবার বিকেলে স্থানীয় ‘মা’ ফার্মেসি থেকে সিরাপ নিয়ে খাওয়ান। এরপর তাদের বমি শুরু হয়। পরে স্বজন ও ফার্মেসির মালিকের পরামর্শে শিশু দুটিকে প্রথমে আশুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে চিকিৎসা প্রদান করে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। বাড়িতে আসার কিছুক্ষণ পর তারা মারা যায়।

স্বজনদের অভিযোগ, সুষ্ঠু চিকিৎসার অভাবে শিশু দুটির মৃত্যু হয়। তারা এ ঘটনায় দায়ীদের বিচার দাবি করেন। এদিকে শুক্রবার ময়নাতদন্তের জন্য পুলিশ শিশু দুটির মরদেহ জেলা সদর হাসপাতালে প্রেরণ করে। এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।

এদিকে ঘটনার পর থেকে ফার্মেসি মালিক দোকান বন্ধ করে পলাতক রয়েছেন এবং মোবাইল ফোনও বন্ধ রয়েছে। এদিকে দুই সন্তান হারিয়ে বাকরুদ্ধ শ্রমিক পিতা-মা। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে আশপাশের পরিবেশ।

শিশুদের মা রেখা বেগম চাচাশ্বশুর ফজলুল হক ও শাশুড়ি জাহানারা বেগম জানায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে দুই ছেলের জ্বর হলে তারা তাদের মাকে ভালো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা জানায়। ভালো ডাক্তারের কাছে নেওয়ার মতো টাকা না থাকায় সন্ধ্যায় ২০ টাকা দিয়ে দুর্গাপুর বাজারের ‘মা’ ফার্মেসি থেকে নাপা সিরাপ কিনে দুইজন খাওয়ানো হয়।

সিরাপ খাওয়ানোর ৫-৬ মিনিটের মধ্যে তাদের বমি শুরু হয়। এ সময় রেখার স্বামী বাড়িতে না থাকায় তারা শিশু দুইজনকে নিয়ে ‘মা’ ফার্মেসির মালিক মাইন উদ্দিনের কাছে গিয়ে বিষয়টি জানায়। মাইন উদ্দিন শিশু দুটিকে দেখে দ্রুত উপজেলা হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।

উপজেলা হাসপাতালে নেওয়ার পর জরুরি বিভাগের চিকিৎসক শিশু দুইটির পরীক্ষা করে অক্সিজেন প্রদান করেন। পরে জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। এ সময় হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় তারা সিএনজিচালিত অটোরিকশা করে সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সদর হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তার শিশু দুটিকে দেখে অবস্থা ভালো জানিয়ে বাড়িতে নিয়ে যাবার পরামর্শ দেন। বাড়িতে নিয়ে আসার কিছুক্ষণের মধ্যে শিশু দুইজন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

স্বজনদের অভিযোগ, তারা দরিদ্র হওয়ায় উপজেলা হাসপাতালে অক্সিজনের স্বল্পতার কথা জানিয়ে একটি সিলিন্ডার থেকে পালাক্রমে দুই শিশুদের অক্সিজেন প্রদান করা হয়েছে এবং সদর হাসপাতালে প্রেরণ করে। সদর হাসপাতালও যথাযথ চিকিৎসা না দিয়ে বা ভর্তি না করিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে। সঠিক চিকিৎসা পেলে শিশু দুটি মারা যেত না বলে দাবি তাদের। তারা দায়িত্বে পালনে অবহেলাকারীদের বিচার দাবি করেন।

শুক্রবার সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, শিশু দুজনের বাড়ি শত শত নারী-পুরুষের ভিড়। দুই সন্তান হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে একটি কক্ষে পড়ে রয়েছে তাদের মা। আগত স্বজনেরা মাথায় তার হাত বুলিয়ে তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। আগত স্বজনদের চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরছে। বাড়ির উঠানে নাতির জন্য পাগলপ্রায় হয়ে বিলাপ করছেন দাদি নিলুফা বেগম। তিনিও কয়েকবার মূর্ছা গেছেন।

আশুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. আনিছুর রহমান বলেন, শিশু দুটি নিয়ে আসার সময় তাদের অক্সিজেন লেভেল ছিল ৭০ শতাংশ। পরে অক্সিজেন লেভেল ৯৮ হয়। স্টোমার্ক (পেট) ওয়াসের ব্যবস্থা ও শিশুবিশেষজ্ঞ না থাকায় জেলা সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।

আশুগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নুপুর সাহা বলেন, প্রয়োজনীয় অক্সিজেন প্রদান করা হয়েছে। এখানে শিশুবিশেষজ্ঞ ও পেট ওয়াসের ব্যবস্থা না থাকায় জেলা সদরে প্রেরণ করা হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, প্যারাসিটাল জাতীয় সিরাপের বিরুপ প্রতিক্রিয়ায় লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কেন শিশুটিকে ভর্তি করা হলো না বা চিকিৎসা না দিয়ে বাড়িতে প্রেরণ করা হলো তা খতিয়ে দেখা হবে। এক্ষেত্রে কারো গাফিলাতি থাকলে বিধি মোতাবেক ব্যাবস্থা নেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে শিশু দুটির বাবা ইসমাইল হোসেন সুজনসহ স্বজনরা জানায়, পুলিশ সব কিছু লিখে নিয়েছে। আমরা আত্মীয়-স্বজন ও মাতবরদের সঙ্গে আলোচনা করে যা করার করব।

আশুগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ আজাদ রহমান বলেন, জিডি মূলে শিশুদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভয়েসটিভি/এমএম
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/69243
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2022 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ