Printed on Sun Dec 05 2021 11:59:59 AM

ডা. সাবরিনা আরিফ দম্পতির ভয়ঙ্কর প্রতারণা

অপরাধজাতীয়
সাবরিনা আরিফ দম্পতির
সাবরিনা আরিফ দম্পতির
ঢাকা : ডা. সাবরিনা চৌধুরী। পেশায় হৃদরোগ সার্জন। টেলিভিশনগুলোর স্বাস্থ্য বিষয়ক টকশোতে নিয়মিত অংশ নিতেন। দিতেন সুস্থ্য থাকার নানা টিপস। সবকিছু ছাড়িয়ে ভয়ঙ্কর প্রতারণার অভিযোগে এখন তিনি ও তার খলনায়ক স্বামী আরিফ চৌধুরী আলোচনায়। যার চতুর্থ স্ত্রী হিসাবেই সাবরিনা পরিচিত। আরিফের দুই স্ত্রী থাকেন রাশিয়া ও লন্ডনে। আরেক স্ত্রী দেশেই থাকেন।

স্ত্রীর অধিকার পাবার জন্য স্বামীর পেছনে হন্যে হয়ে ছুটছেন। এসব বিষয়ে কম যান না সাবরিনাও। আরিফ চৌধুরী তাকে একদিন এক চিকিৎসকরে সঙ্গে অন্তরঙ্গ সময় কাটানো অবস্থায় পেয়েছেন। পরে আরিফের মারধরের শিকার হন ওই চিকিৎসক। এনিয়ে সাবরিনা শেরেবাংলা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন। এসব নিয়ে সেই সময় আলোচনার কমতি ছিল না।

সম্প্রতি পূর্বের আলোচনা ছাড়িয়ে এ দম্পতি নতুন আরেক আলোচনায় এসেছেন। জেকেজি হেলথ কেয়ার নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তারা ২৭ হাজার করোনা রোগীর নমুনা সংগ্রহ করে কোনো রকম পরীক্ষা ছাড়াই ১৫ হাজার ৪৬০টি মনগড়া ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছেন। বাকি ১১ হাজার ৫৪০টি রিপোর্ট দিয়েছে আইইডিসিআরের মাধ্যমে। জেকেজির গুলশানের অফিস থেকে ১৫ হাজার ৪৬০টি ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে এই দম্পতি হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ৮ কোটি টাকা।

করোনার রিপোর্ট জালিয়াতির দায়ে এরইমধ্যে সাবরিনা চৌধুরীর স্বামী আরিফ চৌধুরীসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপির তেজগাঁও ডিভিশন। তারা এখন কারাগারে আছেন। পুলিশি তদন্তে তাদের ভুয়া রিপোর্ট প্রদানের সত্যতাও মেলেছে। এমনকি জালিয়াতির কাজে সংশ্লিষ্টতা মিলেছে ডা. সাবরিনা চৌধুরীর। জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের রেজিষ্টার সার্জন হয়েও তিনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছিলেন। সরকারি চাকরি করেও তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে প্রভাব খাটিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ ভাগাতেন।

জেকেজি প্রতিষ্ঠানের সিইও আরিফ চৌধুরীর নামে জালিয়াতি, সরকারি কাজে বাধা, পুলিশের ওপর হামলাসহ আরও কয়েকটি অভিযোগে চারটি মামলা করেছে পুলিশ। এসব মামলার কোনোটিতেই আসামি করা হয়নি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা চৌধুরীকে। মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রথমদিকে সাবরিনার সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাওয়া না গেলেও পরে তদন্তে সাবরিনার সংশ্লিষ্টতা বেরিয়ে আসছে।

এরইমধ্যে রিপোর্ট জালিয়াতি, তিতুমীর কলেজে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এবং তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সংবাদকর্মীদের ওপর হামলায় সাবরিনার সংশ্লিষ্টতা মিলেছে। আরও কিছু তথ্য প্রমান পেলেই সাবরিনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। যদিও সাবরিনা এই ঘটনার পর থেকেই দাবি করছেন জেকেজির সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। এই প্রতিষ্ঠানটি তার স্বামী আরিফ চৌধুরীর।

এদিকে ১১ জুলাই শনিবার একটি বেসরকারি টেলিভিশনে ডা. সাবরিনা চৌধুরী জেকেজির সঙ্গে বর্তমানে তার সম্পৃক্ততা নেই বলে জানিয়েছেন। আগেই তিনি প্রতিষ্ঠান থেকে সরে এসেছেন। তিনি বলেছেন, জেকেজির চেয়ারম্যান হওয়ার প্রশ্নই উঠে না। এটি ওভাল গ্রুপের একটি অঙ্গসংগঠন। আর ওভাল গ্রুপ একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। যার মালিক আরিফ চৌধুরী। সাবরিনা বলেন, আমি আরিফকে কাজ পাইয়ে দিয়েছি বা দিতাম এগুলো একেবারে মিথ্যা কথা। বরং জেকেজির জাল সনদ তৈরির কথা তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজিকে জানিয়েছেন বলে দাবি করেছেন। তবে আরিফ পুলিশের কাছে শিকার করেছেন জেকেজির সঙ্গে সাবরিনার সম্পৃক্ততা রয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টসূত্র বলছে, সাবরিনা-আরিফ দম্পতি দীর্ঘদিন ধরে দিব্যি জালিয়াতির কারবার চালিয়ে যাচ্ছিলো। হয়তোবা তাদের এমন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কেউই কোনোদিন জানতে পারতো না। তবে তিতুমীর কলেজে করোনার বুথ স্থাপন করে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, গান বাজনা, পার্টি ও কলেজের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারি ও শিক্ষার্থীদের মারধরের ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ তাদের জালিয়াতির বিষয়টি ধরতে পারে। জালিয়াতির ঘটনায়ই ২৫শে জুন পুলিশ আরিফ ও তার ৫ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে । পুলিশ তাদেরকে গ্রেপ্তার করে তেজগাঁও থানায় নিয়ে আসে। এরপর ওইদিন রাতেই আরিফকে থানা থেকে ছাড়িয়ে নিতে একটি বিশেষ দলের পরিচয় দিয়ে অন্তত ৬০/৭০ জন লোক তেজগাঁও থানায় হামলা করেছিলো। হামলাকারীরা ওইদিন থানার কেচিগেট ভাংচুর করে। পুলিশের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকেই হামলাকারী ১৮ জনকে আটক করে পৃথক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, হামলাকারীরা নিজেদের আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের পরিচয় দিয়েছিল। তারা আরিফকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য এতটাই মারমুখী ছিল প্রথমদিকে থানার পুলিশও অসহায় হয়ে পড়েছিল। পরে বাধ্য হয়ে পুলিশ তাদেরকে আটক করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এছাড়া খোদ আরিফকে গ্রেপ্তার করে আনার পর সে পুলিশের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছে। মাদকাসক্ত আরিফ থানায় এসে পুলিশের কাছে নেশাদ্রব্য চেয়ে বসে। পুলিশ তাকে নেশাদ্রব্য না দেওয়াতে সে চড়াও হয়ে থানার সিসি ক্যামেরা ভাংচুর করে।

এদিকে জালিয়াতি ও অন্যান্য মামলায় এখনও সাবরিনাকে গ্রেপ্তার করতে করেনি পুলিশ। পুলিশ বলছে, প্রাথমিকভাবে এসব অনৈতিক কাজে সাবরিনার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। পুরোপুরি সংশ্লিষ্টা পাওয়া গেলেই শিগগির তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে। এছাড়া তাদের এই কর্মকাণ্ডে যারা সহযোগীতা করেছেন তাদের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অপকর্ম করে তারা কত টাকা কামিয়েছেন সে বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে পুলিশ।

পুলিশের তেজগাঁও ডিভিশনের উপ কমিশনার হারুন অর রশীদ শনিবার সংবাদমাধ্যমকে জানান, করোনার জাল সনদ জালিয়াতির ঘটনা মামলা হয়েছে। মামলার তদন্ত চলছে। তদন্তে সাবরিনার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাকেও গ্রেপ্তার করা হবে।

তেজগাঁও পুলিশের একাধিকসূত্র জানিয়েছে, আলোচিত এই ঘটনার তদন্তে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্যই মিলেছে। তদন্তও প্রায় শেষ পর্যায়ে। পুলিশি তদন্তে সাবরিনা ও আরিফের খুঁটির জোরের সন্ধান মিলেছে। যাদের প্রভাব খাটিয়ে তারা বেপরোয়াভাবে অপকর্ম করে যাচ্ছিলো। প্রভাব কাটিয়ে তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে তাদের ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানে করোনার নমুনা সংগ্রহের অনুমতি নিয়ে আসে। শুধুমাত্র তিতুমির কলেজে বুথ স্থাপন করে নমুনা সংগ্রহের অনুমতি পেলেও তারা প্রভাব খাটিয়ে ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে শুরু করে ঢাকার বাইরে থেকেও মাঠকর্মী পাটিয়ে নমুনা সংগ্রহ করত। অল্প কিছুদিনেই তারা ২৭ হাজার মানুষের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে। যারমধ্যে ১৫ হাজারের ওপরে ভুয়া সনদ দিয়েছে।

সাবরিনা-আরিফের দম্পতির জেকেজি প্রতিষ্ঠান ঢাকাসহ, নায়ায়নগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে ৪৪টি বুথ স্থাপন করেছিল। নমুনা সংগ্রহের জন্য মাঠকর্মী নিয়োগ দেয়া ছিল। তাদের হটলাইন নম্বরে রোগীরা ফোন দিলে মাঠ কর্মীরা বাড়ি গিয়েও নমুনা সংগ্রহ করতেন। আবার অনেককে জেকেজির বুথের ঠিকানা দেয়া হতে। এভাবে কর্মীরা প্রতিদিন গড়ে ৫০০ মানুষের নমুনা সংগ্রহ করতো। পরে তাদের গুলশানের একটি ভবনের ১৫ তলার অফিসের একটি ল্যাপটপ থেকে ভুয়া সনদ দিতো। ওই ল্যাপটপ থেকে জিকেজির কর্মীরা রাতদিন শুধু জাল রিপোর্ট তৈরির কাজ করত। প্রতিটা সনদের জন্য নেয়া হতো ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। যদিও শর্ত ছিল বিনামূল্য নমুনা সংগ্রহ করে সরকার নির্ধারিত ল্যাবে পাঠাতে হবে। কিন্তু তারা সকল প্রকার শর্তভঙ্গ করে পরীক্ষা ছাড়াই রিপোর্ট দিত।

শনিবার জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিউট ও হাসপাতালে গিয়ে জানা যায় ডা. সাবরিনা নিয়মিতই অফিস করছেন। হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা পত্রপত্রিকায় সাবরিনার বিষয়ে জেনেছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাননি।

হাসপাতালের অধ্যক্ষ ও পরিচালক ডা. মীর জামাল উদ্দিন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি শুনেছি। সাবরিনা নিয়মিত অফিস করছেন।’

সাবরিনা সরকারি হাসপাতালে চাকরি করে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের মালিক হওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। এখনই কিছু বলা যাবে না। সাবরিনার বিষয়টি তদন্তের জন্য হাসপাতালের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকে বলা হয়েছে।’

ভয়েসটিভি/ডিএইচ
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/7829
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2021 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ