Printed on Wed Jan 19 2022 2:09:19 AM

অভিনেত্রীর বাসার চাকরানি থেকে সুপারস্টার

এম এস নাঈম
বিনোদনভিডিও সংবাদ
সুপারস্টার
সুপারস্টার
বাড়িতে নেই খাবার কেনার মত কোন অর্থ, পরিবারের এমন করুনাবস্থায় পড়াশুনা করা তো বিলাসিতা। ফলে চতুর্থ শ্রেণীতেই পড়াশোনা ছাড়তে হয় তাকে। নেমে পড়েন কাজের সন্ধানে- স্বল্প বেতনে চাকরানি হিসেবে একটি কাজও জুটিয়ে ফেলেন। সঙ্গে বাড়ির অভিনেত্রী মালকিনের মেকআপেও সহযোগিতা করেন।

এরপর এক সময় সুযোগ পেয়ে চলে আসেন ক্যামেরার সামনে- তিনি বিজয়ালক্ষ্মী ভাদালাপতি। নামটির সঙ্গে হয়তো অনেকেই পরিচিত নন এমনকি চলচ্চিত্র জগতেরও হয়তো অনেকে চিনবেন না তাকে এই নামে। তবে ‘সিল্ক স্মিতা’ নামটি শুনলে অনেক কিছুই মনে করতে পারবেন সিনেমাপ্রেমীরা। দক্ষিণের এই বিখ্যাত অভিনেত্রী মাত্র ১৭ বছরের ক্যারিয়ারে চার শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন।

সিল্কের জীবনে উত্তরণের কাহিনী একেবারেই রুপোলি পর্দার গল্পের মতই। ১৯৬০ সালের ২ ডিসেম্বর ভারতের অন্ধ্র প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন সিল্ক। পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েন এবং এলাকার বখাটেদের উত্যক্তের ফলে বাবা-মা তাকে চেন্নাইয়ের কোডামবাক্কামে খালার কাছে পাঠিয়ে দেন। সেখানে তিনি এক অভিনেত্রীর বাড়িতে চাকরাণীর কাজ নেন। সেই অভিনেত্রীর মেকআপেও সহায়তা করেন। একদিন এক প্রযোজক নিজের বড় গাড়ি নিয়ে অভিনেত্রীর বাড়িতে আসলে সিল্ক আকৃষ্ট হয় সেই গাড়ির প্রতি। এনিয়ে অভিনেত্রীর উপহাস এবং তার উত্তরে নিজের গাড়ি কেনার প্রতিশ্রুতিই ছিল সম্ভবত তাঁর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট।

১৯৭৮ সালে কন্নড় ভাষার ‘বেড়ি’ সিনেমার মাধ্যমে অভিনয় জগতে পা রাখেন সিল্ক। পরিচালক বিনু চক্রবর্তী তার নাম বদলে রাখেন স্মিতা। পরের বছর ‘বেদিকাচক্রম’ সিনেমার মাধ্যমে রাতারাতি আলোচনায় চলে আসেন। এই সিনেমায় তার চরিত্রের নাম ছিল সিল্ক। এ ছবির পর থেকেই ‘সিল্ক স্মিতা’ নামে তিনি পরিচিতি পান। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ৭০-এর দশকের শেষের দিক থেকে ৯০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত সিল্ক হয়ে উঠেছিলেন দর্শকদের হার্টথ্রব। স্মিতার একটি মাত্র আইটেম ডান্স যে কোনও ছবিকে বিশাল সাফল্য এনে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। সিলভার স্ক্রিনে তাঁর গ্ল্যামারাস উপস্থিতি দর্শকদের কাছে অসম্ভব আকর্ষণীয় হয়ে উঠছিল। সিল্ককে পর্দায় দেখলেই দর্শকদের চিৎকারের ভাষা ছিল- ‘সিলুক্কু! সিলুক্কু!’

১৯৭০ থেকে ১৯৯০ সাল নাগাদ দক্ষিণের ছবি হিট করার প্রধান মশলা ছিল সিল্কের উপস্থিতি। যে ছবি ফ্লপ করার সম্ভাবনা দেখা যেত, সেই ছবিতে সিল্কের একটি আইটেম নাচ রেখে দিতেন পরিচালকরা। ব্যাস, ছবি হিট! কথিত আছে যে, স্মিতা যদি বলতো- চলো মন্দিরে যাই, সেটাও শুনতে খুব সেক্সি শোনাতো। পর্দার ভেতরে ও বাইরে- সব জায়গাতেই সিল্ক খুব কম কথা বলতো। কিন্তু, সব সময়ই ঠোঁটটা কেমন করে যেন বাঁকিয়ে রাখতো। ‘এমন কোনো ফ্রেম খুঁজে পাওয়া মুশকিল যেখানে স্মিতা নিজের ঠোঁট নিয়ে কোনো কারিশমা করেননি।

সিল্কের হাতে যখন অঢেল টাকা এবং ইন্ডাস্ট্রিতে দারুণ প্রভাব তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন প্রযোজক হবেন। প্রথম দুই সিনেমা প্রযোজনা করতে গিয়ে প্রচুর অর্থ খরচ করলেও ছবিগুলো বক্স অফিসে ব্যর্থ হয়। মনে মনে জেদি হয়ে ওঠেন সিল্ক। শুরু করেন তৃতীয় সিনেমা। কিন্তু এবার টাকায় টান পড়ে। ফলে সিনেমাটা আর শেষ করতে পারেননি। এতে মানসিকভাবে ভীষণ ভেঙে পড়েন। আর্থিক অনটনে বিষণ্ন হয়ে পড়েন।

‘অনেক প্রযোজককে দেউলিয়া হওয়ার দুয়ার থেকে ফিরিয়েছেন স্মিতা। যখন তাদের সামনে আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোনো রাস্তা খোলা ছিল না, তখন কোনো একটা ড্যান্স নাম্বার বা আইটেম গান করে তরুণ, যুবকদের হলে টেনে এনেছেন স্মিতা। কিন্তু, যখন স্মিতার নিজের দরকার ছিল, তখন তিনি কাউকে পাশে পাননি।’
ক্যারিয়ারের শুরু থেকে শেষ দিন পর্যন্ত রহস্যাবৃত স্মিতা অভিনয় জীবনের চূড়ায় থাকাকালীন মাত্র ৩৬ বছরেই আচমকা থেমে যান। দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় এই সাহসী অভিনেত্রীর দেহ ১৯৯৬-এর ২৩শে সেপ্টেম্বর চেন্নাইয়ের নিজ অ্যাপার্টমেন্টে ঝুলন্তাবস্থায় পাওয়া যায়। মৃত্যুর কারণ হিসেবে সুইসাইড নোটে সিল্ক লিখেছিলেন ‘একের পর এক জীবনে ব্যর্থতা এবং হতাশার কারণে মৃত্যুকেই মুক্তির পথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন’। যদিও সিল্কের ক্যারিয়ার তখনও সচল এবং অভিনয়ের অফারও পাচ্ছিলেন। তাহলে হঠাৎ কেন এতোটা বিষণ্ণ হলেন। প্রেমে ব্যর্থতা, আর্থিক ভাবে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া কিংবা অতিরিক্ত অ্যালকোহল আসক্তির মত অনেকগুলো কারণ সামনে চলে আসে আত্মহত্যার পেছনে। তারপরও মূল কারণ আজও অজানা।

বেদিকাচক্রম, জাস্টিস রাজা, কিরাথাম, আন্থম, মাফিয়া, লকআপ ডেথ, জেন্টলম্যান সিকিউরিটি, কার্মা প্রভৃতি সিনেমায় কোমর দুলিয়ে দর্শক হৃদয় জয় করেছেন। তার জনপ্রিয়তা এতোটাই তুঙ্গে ওঠে যে, প্রতিদিন তিন শিফটে কাজ করতেন। প্রতিটি আইটেম গানের জন্য নিতেন ৫০ হাজার রুপি। যা সে সময়ের জন্য সর্বোচ্চ। দক্ষিণী সিনেমার সুপারস্টাররা পর্যন্ত তার সিনেমায় একটি আইটেম গানের জন্য সিল্কের কাছে ধর্না দিতেন। এই তালিকায় রজনীকান্ত, কমল হাসান, চিরঞ্জীবীও আছেন। ১৯৮৯ সালে মালায়ালাম ছবি ‘লায়ানাম’ ছবিতে সিল্ক এক কিশোরের সাথে শারীরিক সম্পর্কে জড়ান। সিল্কের মৃত্যুর ছয় বছর পর ২০০২ সালে ছবিটি হিন্দি ভাষায় ডাবিং করে ‘রেশমা কি কাহানি’ নামে মুক্তি দেওয়া হয়। তখনও ছবিটা আলোড়ন তুলেছিল।

আরও পড়ুন : বিচ্ছেদের পর কারগিলে একসঙ্গে আমির-কিরণ

এতো আলো ঝলমল যার জীবন, সে কিন্তু ব্যক্তি জীবনে ছিলেন আত্মকেন্দ্রীক। বন্ধুর সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। অল্পতেই রেগে যেতেন। সরাসরি কথা বলতে পছন্দ করতেন। এজন্য অনেকে তাকে অহঙ্কারী মনে করতেন। তবে তিনি সময় মতো শুটিং সেটে হাজির হতেন। ছিলেন দায়িত্বশীল। ভক্তদের কাছে তিনি ছিলেন শিশুসুলভ।

২০১১ সালে মিলন লুথিয়া নির্মিত স্মিতার বায়োপিক ‘ডার্টি পিকচার’ বের হলে যারা সিল্ককে চিনতেন, তাঁদের দাবী ছিল বিদ্যা বালান চরিত্রটির সাথে মানাতে পারেননি। আসলে, অন্য কোনো অভিনেত্রীই নাকি চাইলেই সিল্ক স্মিতা হতে পারেননি। তিনি আবেদনময়ী, কিন্তু অশ্লীল নন। তিনি ভঙ্গুর, কিন্তু তেজদীপ্ত। তিনি হলেন পানশালার ওই নর্তকী যিনি প্রয়োজনে নায়ককে বাঁচাতে গুলিটা নেবেন নিজের বুকে। যতক্ষণ তিনি পর্দায় থাকতেন, হলের পুরুষরা নাকি চোখের পাতাই ফেলতেন না। আসলে সেটাই তো ছিল সিল্কের কাজ। তিনি কোমড় দোলাবেন, চোখের পাতা নাচাবেন। তার সাথে সাথে নাচবে পুরুষের মন। এর জন্য সিল্কের সংগ্রামটাও কম ছিল না। নিয়মিত যোগবব্যায়াম করে ফিট থাকতেন।

স্মিতার শূন্যতা পুরনে ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছিলেন শাকিলা। ভাবা হচ্ছিল, নতুন স্মিতা হবেন এই শাকিলা। কিন্তু, অর্ধযুগের চেষ্টায় সিল্কের ধারের কাছেও পৌঁছাতে পারেননি তিনি। সবাই তো আর সিলুক্কু হতে পারে না!

আরও পড়ুন : দেশের সেরা ১০ সুন্দরী আবেদনময়ী নায়িকা!

ভয়েস টিভি, নিউজ ডেস্ক
যোগাযোগঃ
ভয়েস টিভি ৮০/৩, ভিআইপি রোড, খান টাওয়ার, কাকরাইল,
ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ
ফোনঃ +৮৮ ০২ ৯৩৩৮৫৩০
https://bn.voicetv.tv/news/59760
© স্বত্ব ভয়েস টিভি 2022 — ভয়েস টিভি
শাপলা মিডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান
সর্বশেষ সংবাদ